সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় গাজী নজরুল ইসলামের চার দিন এবং তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকসুদা ইসলামের এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ এহসানুল ইসলামের আদালত উভয় পক্ষের শুনানি শেষে এ আদেশ দেন। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শেরেবাংলা নগর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) শামসুজ্জোহা সরকার দুই আসামির সাত দিন করে রিমান্ড চেয়েছিলেন।
রাষ্ট্রপক্ষে ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী রিমান্ডের পক্ষে শুনানি করেন। অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবী মাহবুবুর রহমানসহ কয়েকজন রিমান্ড বাতিলের পাশাপাশি জামিনের আবেদন করেন।
এর আগে বিকেল ৩টা ১১ মিনিটে গাজী নজরুল ইসলামকে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট ও হেলমেট পরিয়ে আদালতে নেওয়া হয়। এ সময় তিনি আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলেন, মামলার এজাহার পড়েন এবং পরে ওকালতনামায় স্বাক্ষর করেন।
### রিমান্ড আবেদনে পুলিশের ৫ কারণ
পুলিশের আবেদনে বলা হয়েছে, মরিয়ম খাতুন ফাঁস দিয়ে মৃত্যুর সময় একই বাসায় এজাহারভুক্ত গ্রেপ্তার আসামিরা ছিলেন। তাঁর আত্মহত্যায় তাঁদের কোনো প্রভাব ছিল কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন।
এ ছাড়া মরিয়মকে আত্মহত্যায় প্ররোচনা, উসকানি, মানসিক চাপ বা ভয়ভীতি দেখানোর ঘটনায় আসামিদের ভূমিকা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
মামলার এজাহারভুক্ত পলাতক আসামি ওবায়দুর রহমানের ভূমিকা জানার পাশাপাশি তাঁর অবস্থান শনাক্ত করে গ্রেপ্তার এবং অন্য কোনো অজ্ঞাত ব্যক্তি জড়িত কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আনার কথা জানিয়েছে পুলিশ। একই সঙ্গে মামলার মূল রহস্য উদঘাটনের জন্য আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন বলে রিমান্ড আবেদনে উল্লেখ করা হয়।
### যেভাবে শুরু হয় মামলা
এর আগে রোববার রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের ন্যাম ভবনের ৫ নম্বর ভবনের তৃতীয় তলার ২০৩ নম্বর ফ্ল্যাট থেকে গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
এ ঘটনায় মরিয়মের বাবা মো. মাসুম বিল্লাহ বাদী হয়ে শেরেবাংলা নগর থানায় আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলা করেন। মামলায় গাজী নজরুল ইসলাম, তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকসুদা ইসলাম এবং শ্যালক ওবায়দুর রহমানকে আসামি করা হয়।
মামলার এজাহারে বাদী দাবি করেন, গত জুনে ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী গাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে মরিয়মের বিয়ে হয়। সংসদ সদস্য হওয়ায় নজরুল, তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকসুদা ও মরিয়ম ন্যাম ভবনের ওই ফ্ল্যাটে বসবাস করতেন।
এজাহারে আরও অভিযোগ করা হয়, বিয়ের পর থেকে নজরুল ও তাঁর প্রথম স্ত্রী বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মরিয়মকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করতেন। বিষয়গুলো মরিয়ম বিভিন্ন সময়ে মোবাইল ফোনে তাঁর পরিবারকে জানিয়েছিলেন বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
বাদীর ভাষ্য অনুযায়ী, ২০ সেপ্টেম্বর বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে গাজী নজরুল মরিয়মের বাবাকে ফোন করে দ্রুত বাসায় আসতে বলেন। সেখানে গিয়ে তিনি অনেক লোকজন দেখতে পান। পরে ঘরের ভেতরে মরিয়মকে ওড়না দিয়ে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পান।
পুলিশের সহায়তায় দরজা ভেঙে ঘরে প্রবেশের পর বিছানার ওপর মরিয়মের লেখা একটি সুইসাইড নোট পাওয়া যায় বলেও মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে। আসামিদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন এবং প্ররোচনার কারণে মরিয়ম আত্মহত্যা করেছেন—এমন অভিযোগ করেছেন তাঁর বাবা।
আগের মামলাও ছিল গাজী নজরুলের বিরুদ্ধে
এর আগে মরিয়মের সঙ্গে গাজী নজরুল ইসলামের ‘ব্যক্তিগত মুহূর্তের’ কয়েকটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি আলোচনায় আসে। এরপর ২১ জুলাই গাড়িচালক ও মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমান বাদী হয়ে পল্লবী থানায় একটি মামলা করেন। সেখানে অনৈতিক সম্পর্কের প্রতিবাদ এবং ভিডিও ফাঁসের সন্দেহে মারধর ও শ্বাসরোধ করে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ আনা হয়েছিল।
ওই মামলায় গত ১০ আগস্ট হাইকোর্ট থেকে আট সপ্তাহের জামিন পান গাজী নজরুল ইসলাম। এবার মরিয়মের আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় সেই মামলার বাদী ওবায়দুর রহমানকেও আসামি করা হয়েছে।
এদিকে, মরিয়মের সঙ্গে গাজী নজরুল ইসলামের ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর ২২ জুলাই তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির পক্ষ থেকে সাংগঠনিক তদন্তে নৈতিক স্খলনের প্রমাণ পাওয়ার দাবি করে নির্বাচন কমিশনকেও বিষয়টি জানানো হয়।