নেত্রকোনার দুর্গাপুরে সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকিরকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় অজ্ঞাতপরিচয় আটজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। নিহতের স্ত্রী অনিন্দিতা সাংমা বাদী হয়ে শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) রাতে দুর্গাপুর থানায় মামলাটি করেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার সাকের আহমেদ।
মামলার পর হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। ঘটনাস্থল ও আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ, বিভিন্ন আলামত এবং নিহত সাংবাদিকের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত পোস্ট পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে জড়িতদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
প্রাণনাশের আশঙ্কার তথ্যও তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, মৃত্যুর আগে আলিফ পুলিশকে বলেছিলেন, তাঁকে পেলেই গুলি করে হত্যা করা হতে পারে। তাঁর এই আশঙ্কার পেছনে কী কারণ ছিল, তিনি কারও কাছ থেকে হুমকি পেয়েছিলেন কি না এবং এর সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে।
গত বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) রাত সোয়া আটটার দিকে দুর্গাপুরের শ্যামগঞ্জ-বিরিশিরি সড়কের তেলনজিয়া বাজারে একটি চায়ের দোকানের সামনে আলিফকে গুলি করা হয়। পরে তাঁকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়।
আলিফ বেসরকারি আইপিটিভি চ্যানেল ‘রূপসী বাংলা’র নেত্রকোনা প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পাশাপাশি ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামে একটি ফেসবুক পেজ পরিচালনা করতেন। ওই পেজে দুর্নীতি, অনিয়ম, অপরাধ ও সীমান্ত এলাকার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে লেখালেখি করতেন তিনি।
এ কারণে তাঁর সাম্প্রতিক পোস্ট ও প্রতিবেদনগুলোও তদন্তের আওতায় আসতে পারে। হত্যার আগে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে তিনি লিখেছিলেন কি না, প্রকাশিত প্রতিবেদন নিয়ে কারও সঙ্গে বিরোধ হয়েছিল কি না কিংবা কোনো হুমকি পেয়েছিলেন কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
জার্মানভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলের এক প্রতিবেদনে স্থানীয় মাদক ব্যবসা ও চোরাচালানের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের বিষয়ে পুলিশের সন্দেহের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে কারা জড়িত বা এর প্রকৃত কারণ কী, সে বিষয়ে পুলিশ এখনো চূড়ান্ত কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি। কাউকে দায়ী করার মতো চূড়ান্ত প্রমাণও প্রকাশ্যে আসেনি।
ময়নাতদন্তে শরীরে গুলির আঘাত, উদ্ধার একটি গুলি
শুক্রবার নেত্রকোনা সদর হাসপাতালে আলিফের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক শ্রদ্ধ্যানন্দ নাথ সাংবাদিকদের জানান, নিহতের শরীরে গুলির আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। ময়নাতদন্তের সময় শরীরের ভেতর থেকে একটি গুলি উদ্ধার করা হয়। ক্ষতের ধরন পর্যালোচনা করে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়েছে, গুলিগুলো সামনের দিক থেকে ছোড়া হয়ে থাকতে পারে।
ময়নাতদন্ত শেষে শুক্রবার বিকেল পাঁচটার দিকে কলমাকান্দা উপজেলার পোগলা ইউনিয়নের সুনই গ্রামে আলিফের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।
স্ত্রীর দাবি, জড়িতদের শনাক্ত করে শাস্তি দেওয়া হোক
আলিফের স্ত্রী অনিন্দিতা সাংমা স্বামী হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত এবং জড়িত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন। তিনি বলেন, স্বামীকে আর ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়। তবে হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হোক।
স্বজনদের তথ্যমতে, প্রায় ছয় বছর আগে অনিন্দিতা সাংমার সঙ্গে আলিফের বিয়ে হয়। তাঁদের চার বছর বয়সী মেয়ে প্রান্তি ও দেড় বছর বয়সী ছেলে আইয়ান সাফয়ান রয়েছে। আলিফ কলমাকান্দা উপজেলার সুনই গ্রামের মহব্বত আলী ফকিরের ছেলে। স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে তিনি শ্বশুরবাড়ি তেলনজিয়া এলাকায় বসবাস করতেন।
এদিকে সাংবাদিক আলিফ হত্যার দ্রুত তদন্ত, জড়িতদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন কর্মসূচি পালিত হয়েছে। শুক্রবার ময়মনসিংহ প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন করে সাংবাদিকরা হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানান।
এখন তদন্তে সিসিটিভি ফুটেজ, ঘটনাস্থলের আলামত, আলিফের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত পোস্ট, তাঁর আগের প্রাণনাশের আশঙ্কা এবং সম্ভাব্য বিরোধের তথ্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, সেদিকেই নজর রয়েছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী করা যাচ্ছে না।