কক্সবাজারের রামুতে ধানক্ষেতে বৈদ্যুতিক তারের ফাঁদ বসিয়ে পৈশাচিক পদ্ধতিতে এক হাতিকে হত্যা করা হয়েছে। এক কৃষক পরিবার হাতিটি হত্যার পর উল্লাস প্রকাশ করে। এরপর আত্মীয়-স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশীকে ডেকে হাতিটিকে টুকরা টুকরা করে সেই ধানক্ষেতেই পুঁতে ফেলে। রামুর খুনিয়া পালং ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের গাইনপাড়া পাহাড়ী এলাকায় সোমবার মধ্যরাত থেকে মঙ্গলবার ভোর পর্যন্ত সময়ে ঘটেছে এ ঘটনা।
বনকর্মী ও পুলিশ বন্য পশু হত্যার ঘটনায় নেতৃত্বদানকারী সেই কৃষক নজির আহমদ (৬৭)কে গ্রেপ্তার করেছে। কক্সবাজারের দক্ষিণ বন বিভাগের ধোয়া পালং রেঞ্জের খুনিয়া পালং বন বীট এলাকায় সংঘটিত পরিকল্পিত হাতি হত্যার ঘটনায় কৃষক নজির আহমদের ৪ ছেলেসহ মোট ১২ জনকে আসামি করে আজ মঙ্গলবার মামলা দায়ের করা হয়েছে।
ঘটনার বিবরণ দিয়ে কক্সবাজার দক্ষিণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. হুমায়ূন কবির জানান- ‘এটা অত্যন্ত পরিকল্পিত এবং নির্মম ঘটনা। আনুমানিক ২৫ বছর বয়স্ক মা হাতিটিকে হত্যার পর পা এবং শুঁড় কেটে পৃথক করে ফেলা হয়। তারপর ধানক্ষেতে গর্ত করে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টাও করা হয় মরদেহ মাটি চাপা দিয়ে।’
তিনি বলেন, ওই এলাকাটিতে বন বিভাগের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যে কয়েকবার মানুষ-হাতি দ্বন্দ্ব নিরসন উপলক্ষে সচেতনতামূলক সভা ও মাইকিংও করা হয়েছিল।
বিভাগীয় বন কর্মকর্তা বলেন, হাতি হত্যার ঘটনায় মঙ্গলবার সকালে গ্রেপ্তার হওয়া কৃষক নজির আহমদ ঘটনার কথা অকপটে স্বীকার করে জানিয়েছেন, সোমবার দিনের বেলায় তাদের ধানক্ষেতে ৭টি হাতির একটি পাল এসেছিল। পালে ২টি বাচ্চাও ছিল। হাতির পালটিকে দিনের বেলায় ধাওয়া দিলে পাহাড়ে ঢুকে পড়ে। রাতের বেলায় হাতি আবারো আসতে পারে এমন অশংকায় কৃষক নজির আহমদ লম্বা বৈদ্যুতিক তারের ফাঁদ ধানক্ষেতে টাঙিয়ে দেন। রাতে পাড়ার লোকজন শান্ত হলে ঠিকই পাহাড় থেকে হাতি ধানক্ষেতে নেমে পড়ে। আর অমনি কৃষক নজিরের পাতা বৈদ্যুতিক ফাঁদে মা হাতিটি আটকা পড়ে নিথর হয়ে যায়।
হাতিটির মৃত্যু নিশ্চিত হয়ে ক্ষেত পাহারায় থাকা কৃষক নজির ও তার ৪ ছেলে পাড়ার স্বজনদের ডেকে আনেন। তারা ধারাল দা, খন্তি ও কোদাল জোগাড় করে হাতিটিকে টুকরা করার পর গর্ত করে মাটিচাপা দিতে দিতে সকাল হয়ে যায়। এতে করে ঘটনা জানাজানি হয়ে পড়ে। বনকর্মীরা ঘটনাস্থল থেকে বৈদ্যুতিক তারসহ অন্যান্য সব আলামত জব্দ করে।
স্থানীয় খুনিয়া পালং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুল মাবুদ বলেন- ‘আমি ঘটনার কথা শুনেই এলাকায় গিয়ে নির্মমতা দেখে এসেছি। আমার ইউনিয়নে গত দুই বছরে এটিসহ তিনটি হাতি হত্যার শিকার হলো।’
কক্সবাজারের বনাঞ্চলে মহাবিপন্ন এশিয়ান হাতিকে একের পর এক হত্যার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে পরিবেশ বিষয়ক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘এনভায়রনমেন্ট পিপল’ এর প্রধান নির্বাহী রাশেদুল মজিদ জানিয়েছেন, ফাঁদ পেতে, গুলি করে, বৈদ্যুতিক শক দিয়ে একের পর এক হাতি হত্যা করেই ক্ষান্ত হচ্ছে না অপরাধীরা। এখন হাতিকে হত্যা করে খন্ড খন্ড করে পুঁতে ফেলা হচ্ছে।
তিনি বলেন, কক্সবাজার এলাকায় এভাবে গত তিন বছরে ১৬টি হাতি হত্যা করা হয়েছে। গত বছর নভেম্বর মাসেও রামু এবং চকরিয়ায় মাত্র ৮ দিনে ৩টি হাতি হত্যার শিকার হয়েছিল।
এশিয়ান হাতিকে মহাবিপন্ন উল্লেখ করে এনভায়রনমেন্ট পিপল-এর প্রধান নির্বাহী রাশেদুল মজিদ আরো জানিয়েছেন, সারা দেশের ২৬৮টি মহাবিপন্ন এশিয়ান হাতির দুই তৃতীয়াংশের বসবাস কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে। কিন্তু কক্সবাজার ও পার্শ্ববর্তী বনাঞ্চলে রেললাইন, রোহিঙ্গা বসতি, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প, অবৈধ জবর-দখলসহ বিভিন্ন কারণে এসব হাতির নিরাপদ আবাসস্থল, পর্যাপ্ত খাদ্য, নিরাপদ চলাচল (করিডর) চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। যার কারণে এসব হাতি লোকালয়ে হানা দিচ্ছে। এতে হাতি ও মানুষের মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি হচ্ছে।