এক বা দুই বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়া ৪ লাখ ২২ হাজার ৯০৫ শিক্ষার্থীর পরীক্ষা এক মাসের মধ্যে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। শিক্ষার্থীদের যেন একটি বছর নষ্ট না হয়, সে বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহসানুল হক মিলন।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) সকালে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ পরিকল্পনার কথা জানান।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, এবার এক বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছে ২ লাখ ৯৮ হাজার ৪০ জন এবং দুই বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছে ১ লাখ ২৪ হাজার ৮৬৫ জন। সব মিলিয়ে এক বা দুই বিষয়ে ফেল করা শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৪ লাখ ২২ হাজার ৯০৫। এ ছাড়া এবার মোট অকৃতকার্য হয়েছে ৫ লাখ ৯৪ হাজার ৪১৩ জন।
তিনি বলেন, এক বা দুই বিষয়ে অনুত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের এক মাসের মধ্যে পরীক্ষা নেওয়া হবে, যাতে তাদের পরবর্তী শিক্ষাবর্ষে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে একটি বছর নষ্ট না হয়।
পরীক্ষার সময় নির্ধারণের বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, সাত বা ১৫ দিনের মধ্যে পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব হলেও এতে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির ঘাটতি থাকতে পারে। আবার বেশি দেরি হলে ভর্তি কার্যক্রমেও প্রভাব পড়বে। তাই শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে পরীক্ষার সময় ঠিক করা হবে। তবে এক মাসের বেশি সময় দেওয়া সম্ভব হবে না।
এসএসসি পরীক্ষার খাতা পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন আগামী ১ থেকে ৭ নভেম্বর পর্যন্ত করা যাবে বলে জানান শিক্ষামন্ত্রী। আবেদন পাওয়ার পর খাতা পুনর্নিরীক্ষণ করা হবে।
তিনি জানান, গত এসএসসি পরীক্ষায় প্রায় ১৩ লাখ খাতা পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন জমা পড়েছিল। সেগুলো যাচাই করে ৪৫ হাজার শিক্ষার্থীর গ্রেড পরিবর্তন হয়। তাঁদের মধ্যে প্রায় পাঁচ হাজার শিক্ষার্থী ফেল থেকে পাস করে এবং ৩ হাজার ৭৯ জন নতুন করে জিপিএ-৫ পায়।
পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন ও ফল প্রকাশে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, পরীক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং খাতা মূল্যায়নে গুরুতর ভুলের ক্ষেত্রে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়েও কাজ চলছে। প্রধানমন্ত্রী চান, প্রত্যেক শিক্ষার্থী যেন তার প্রাপ্য মূল্যায়ন পায় এবং কেউ অবমূল্যায়নের শিকার না হয়।
এবারের ফলাফলে শিক্ষার্থীদের শেখার ঘাটতি স্পষ্ট হয়েছে উল্লেখ করে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, এসব ঘাটতি চিহ্নিত করে তা পূরণে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা বোর্ড কাজ করবে। এ ক্ষেত্রে শিক্ষক ও অভিভাবকদেরও সহযোগিতা প্রয়োজন।
পাসের হার কমে যাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, গত বছর এসএসসি পরীক্ষায় পাসের হার ছিল ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ। এবার তা কমে ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ হয়েছে। পাসের হার কমে যাওয়াকে সন্তোষজনক মনে করেন না তিনি। শিক্ষার্থীদের শেখার পদ্ধতি, অভিভাবকদের ভূমিকা ও শিক্ষার পরিবেশসহ বিভিন্ন বিষয় পর্যালোচনা করে ঘাটতির কারণ খুঁজে বের করতে হবে।
কোন বিষয়ে সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে—এমন প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী জানান, ইংরেজিতে ২ লাখ ৪৩ হাজার ৫২৮ জন এবং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়ে ১৩ হাজার ৮৪৯ জন ফেল করেছে। ইংরেজি বিষয়ে দক্ষতা বাড়াতে শিক্ষক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে।
শূন্য পাসের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে উল্লেখ করে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, এসব প্রতিষ্ঠান নিয়ে মন্ত্রণালয় পর্যালোচনা করবে। প্রয়োজনে আশপাশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একীভূত করার বিষয়টি বিবেচনা করা হতে পারে। তবে এতে শিক্ষকদের চাকরি হারানোর আশঙ্কা নেই বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।
শিক্ষার্থীদের নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত থাকা, বাড়িতে পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা এবং মোবাইল আসক্তি ও মাদক থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানান তিনি। শিক্ষাকে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে এবং এ খাতে বাজেট বরাদ্দও বাড়ানো হয়েছে বলে জানান শিক্ষামন্ত্রী।
আগের বছরগুলোতে পাসের হার বেশি থাকার বিষয়ে তদন্ত হবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, খাতা মূল্যায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পুনর্নিরীক্ষণের পর ফলাফলে কোনো ত্রুটি ছিল কি না, তা আরও স্পষ্ট হবে। পরীক্ষক ও শিক্ষকদের কাজেও কোনো ঘাটতি ছিল কি না, তা পর্যালোচনা করা হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে জিপিএর শর্ত শিথিল করা হবে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিজেদের মানদণ্ড অনুযায়ী শিক্ষার্থী ভর্তির সিদ্ধান্ত নেবে। তবে উচ্চশিক্ষায় ভর্তির সুযোগ সবার জন্য থাকবে। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ মিলিয়ে এবার প্রায় ১৩ লাখ ৪০ হাজার আসন রয়েছে, বিপরীতে পাস করেছে প্রায় ১২ লাখ শিক্ষার্থী।
এনসিটিবির কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এবং প্রশ্নপত্র ও খাতা মূল্যায়নে অনিয়মের প্রসঙ্গে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ২০২৬ সালের সংশোধনীর মাধ্যমে এসব বিষয় খতিয়ে দেখার সুযোগ তৈরি হয়েছে। পুনর্নিরীক্ষণে ৪৫ হাজার শিক্ষার্থীর গ্রেড পরিবর্তনের ঘটনা খাতা মূল্যায়নের দুর্বলতা নির্দেশ করে।
তিনি আরও জানান, কোথাও কোথাও এমসিকিউ প্রশ্নপত্র পরিবর্তন এবং সংঘবদ্ধভাবে ফলাফল বদলে দেওয়ার অপচেষ্টার ঘটনা ধরা পড়েছে। অন্য ঘটনাগুলোও তদন্ত করে দেখা হবে। পরীক্ষা পদ্ধতি, শিক্ষা বোর্ড, পরীক্ষক ও প্রশ্নপত্র ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন পর্যায়ে দীর্ঘদিনের দুর্বলতা রয়েছে। সেগুলো ধাপে ধাপে চিহ্নিত করে