দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সাবেক উপসহকারী পরিচালক মো. শরীফ উদ্দিনের চাকরিতে ফেরার পথ খুলেছে। তাঁকে জ্যেষ্ঠতা ও বকেয়া সব সুযোগ-সুবিধাসহ পুনর্বহালের নির্দেশ দিয়ে হাইকোর্টের দেওয়া রায়ের বিরুদ্ধে করা লিভ টু আপিল প্রত্যাহার করেছে দুদক।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) শরীফ উদ্দিনের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সালাহ উদ্দীন দোলন এ তথ্য জানিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতে লিভ টু আপিল প্রত্যাহার হওয়ায় হাইকোর্টের রায় বহাল রয়েছে। ফলে শরীফ উদ্দিনের চাকরিতে ফেরার ক্ষেত্রে আর কোনো আইনি বাধা নেই।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে গত বছর আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন করেছিল দুদক। পরে সংস্থাটি সেই আবেদন প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেয়। গত ১৫ অক্টোবর আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত এ বিষয়ে আদেশ দেন।
আদালতের আদেশে বলা হয়, দুদকের পক্ষে উপস্থিত আইনজীবী লিভ টু আপিলটি আর পরিচালনা না করার নির্দেশনা পাওয়ার কথা জানান। এরপর আবেদনটি খারিজ করা হয়।
আইনজীবী সালাহ উদ্দীন দোলন বলেন, জ্যেষ্ঠতা ও বকেয়া সব সুযোগ-সুবিধাসহ শরীফ উদ্দিনকে চাকরিতে পুনর্বহালের নির্দেশ দিয়ে হাইকোর্ট যে রায় দিয়েছিলেন, তা বহাল রয়েছে।
যেসব অনুসন্ধানে আলোচনায় আসেন শরীফ
দুদকের চট্টগ্রাম সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে প্রায় তিন বছর দায়িত্ব পালন করেন শরীফ উদ্দিন। এ সময়ে সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি, ভূমি অধিগ্রহণে অনিয়ম, রোহিঙ্গাদের জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্ট জালিয়াতি এবং ইয়াবা চোরাচালানসহ একাধিক আলোচিত ঘটনার অনুসন্ধান করেন তিনি।
তাঁর অনুসন্ধানে তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা, সরকারি কর্মকর্তা ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নাম উঠে আসে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। চাকরির মেয়াদে প্রায় অর্ধশত মামলা এবং ২০টির বেশি অভিযোগপত্র দাখিলের তথ্যও রয়েছে।
কক্সবাজারের ভূমি অধিগ্রহণ শাখার দুর্নীতি, রোহিঙ্গাদের জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্ট জালিয়াতি এবং কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের নিয়োগ, পদোন্নতি ও গ্যাস সংযোগে অনিয়মের অভিযোগ নিয়েও অনুসন্ধান করেন তিনি। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান করে ১৮২ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন তৈরির কথাও জানা যায়।
২০২১ সালের ১৬ জুন তাঁকে চট্টগ্রাম থেকে পটুয়াখালীতে বদলি করা হয়। দায়িত্ব পালনের সময় প্রাণনাশের হুমকি পাওয়ার অভিযোগে তিনি থানায় সাধারণ ডায়েরিও (জিডি) করেছিলেন।
এরপর ২০২২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি দুদকের পটুয়াখালী কার্যালয়ে কর্মরত অবস্থায় তাঁকে চাকরি থেকে অপসারণ করা হয়। দুদকের তৎকালীন আদেশে বলা হয়েছিল, দুর্নীতি দমন কমিশন (কর্মচারী) বিধিমালা, ২০০৮-এর ৫৪(২) বিধিতে দেওয়া ক্ষমতাবলে তাঁকে অপসারণ করা হয়েছে। ওই আদেশে বিধি অনুযায়ী ৯০ দিনের বেতন ও প্রযোজ্য সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার কথা উল্লেখ ছিল।
চাকরিচ্যুতির ঘটনাটি তখন ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দেয়। অপসারণের আদেশ প্রত্যাহার এবং সংশ্লিষ্ট বিধি বাতিলের দাবিতে দুদকের বিভিন্ন দপ্তরে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মানববন্ধন করেন।
যেভাবে আইনি লড়াইয়ে চাকরিতে ফেরার পথ
চাকরিচ্যুতির আদেশ এবং দুদক কর্মচারী বিধিমালার ৫৪(২) বিধির বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ২০২২ সালের ১৩ মার্চ হাইকোর্টে রিট করেন শরীফ উদ্দিন।
রিটের শুনানির সময় একই বিধির আওতায় দুদকের আরেক কর্মকর্তা মো. আহসান আলীকে চাকরিচ্যুত করার ঘটনায় করা মামলা আপিল বিভাগে বিচারাধীন থাকার বিষয়টি আদালতের নজরে আসে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২২ সালের ২৫ মে ওই আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত শরীফের রিটের শুনানি মুলতবি করেন হাইকোর্ট।
পরে হাইকোর্টের আদেশ স্থগিত চেয়ে ২০২২ সালের ১৬ জুন আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল করেন শরীফ উদ্দিন। ২০২৩ সালের ১৬ মার্চ আপিল বিভাগ দুদকের করা আপিল মঞ্জুর করে রায় দেন। এতে ৫৪(২) বিধি বাতিল করে হাইকোর্টের দেওয়া আগের রায় বাতিল হয়।
একই বছরের ২১ ডিসেম্বর প্রকাশিত পূর্ণাঙ্গ রায়ে আপিল বিভাগ উল্লেখ করেন, দুদক কর্মচারী বিধিমালার ৫৪(২) বিধি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে প্রয়োগ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে কমিশনকে ১২ দফা পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশনা অনুসরণের কথা বলা হয়।
এরপর শরীফ উদ্দিনের রিট আবারও হাইকোর্টে শুনানির জন্য উপস্থাপন করা হয়। ২০২৪ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি আদালত রুল জারি করেন।
চূড়ান্ত শুনানি শেষে ২০২৫ সালের ৯ জুলাই হাইকোর্ট শরীফ উদ্দিনকে চাকরিচ্যুতির ২০২২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারির আদেশ আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে আদেশটি শুরু থেকেই বাতিল বলে গণ্য করে তাঁকে জ্যেষ্ঠতা ও বকেয়া সব সুযোগ-সুবিধাসহ চাকরিতে পুনর্বহালের নির্দেশ দেন। রায়ের অনুলিপি পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে নির্দেশ বাস্তবায়ন করতে বলা হয়েছিল।
দুদক ওই রায়ের বিরুদ্ধে লিভ টু আপিল করলেও শেষ পর্যন্ত তা আর পরিচালনা করেনি। গত ১৫ অক্টোবর আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত আবেদনটি খারিজ করেন। এতে হাইকোর্টের পুনর্বহালের রায় বহাল থাকায় দীর্ঘ সাড়ে চার বছরের বেশি সময় পর দুদকের চাকরিতে ফেরার আইনি পথ খুলেছে শরীফ উদ্দিনের।