সিলেটের বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে রায়হান আহমদকে নির্যাতন করে হত্যার আলোচিত মামলায় পুলিশের বহিষ্কৃত উপপরিদর্শক (এসআই) আকবর হোসেন ভূঁইয়াকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) বিকেলে সিলেট মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক আব্দুল মজিদ মুন্সী এ রায় ঘোষণা করেন।
মামলায় আরও দুই আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং তিনজনকে সাত বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আদালতের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) মোহাম্মদ মুমিনুল ইসলাম মোমিন রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
যেভাবে পুলিশ ফাঁড়িতে নেওয়া হয় রায়হানকে
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০২০ সালের ১০ অক্টোবর গভীর রাতে সিলেট নগরীর আখালিয়া এলাকার বাসিন্দা রায়হান আহমদকে (৩৪) বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তৎকালীন ফাঁড়ি ইনচার্জ এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়াসহ কয়েকজন পুলিশ সদস্য তাঁর ওপর নির্যাতন চালান বলে তদন্তে উঠে আসে।
প্রায় এক ঘণ্টা ধরে চলা নির্যাতনে রায়হানকে মারধর করা হয়। তদন্তে তাঁর হাত ও পায়ের কয়েকটি নখ উপড়ে ফেলার তথ্যও উঠে আসে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরদিন ১১ অক্টোবর সকালে সেখানে তাঁর মৃত্যু হয়।
ময়নাতদন্তে ১১১টি আঘাতের চিহ্ন
ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে রায়হানের শরীরে মোট ১১১টি আঘাতের চিহ্ন পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়। এর মধ্যে ৯৭টি ছিল ফোলা আঘাত এবং ১৪টি গুরুতর আঘাতের চিহ্ন। তাঁর ডান হাতের কনিষ্ঠ আঙুল ও বাঁ হাতের অনামিকা আঙুলের নখ উপড়ে ফেলার চিহ্নও পাওয়া যায়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা আগে তাঁর ওপর নির্যাতন চালানো হয়েছিল। শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর আঘাতের পাশাপাশি চামড়ার নিচে প্রায় দুই লিটার রক্ত জমে থাকার তথ্যও উল্লেখ করা হয়।
ময়নাতদন্তের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, অতিরিক্ত আঘাতের কারণে হাইপোভলিউমিক ও নিউরোজেনিক শক তৈরি হয়। এর ফলে মস্তিষ্ক, হৃৎপিণ্ড, ফুসফুস ও কিডনিসহ গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোর কার্যক্ষমতা ব্যাহত হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়।
মামলা, তদন্ত ও বিচার
রায়হানের মৃত্যুর ঘটনায় তাঁর স্ত্রী তাহমিনা আক্তার বাদী হয়ে সিলেটের কোতোয়ালি থানায় নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইনে মামলা করেন। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হলে সিলেট মহানগর পুলিশ একটি অনুসন্ধান কমিটি গঠন করে। কমিটির তদন্তে বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে রায়হানকে নির্যাতনের বিষয়টি উঠে আসে।
২০২০ সালের ১২ অক্টোবর তৎকালীন ফাঁড়ি ইনচার্জ এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়াসহ চার পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। একই ঘটনায় আরও তিন পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার করা হয়।
এরপর মামলার তদন্ত ও বিচারিক কার্যক্রম এগিয়ে চলে। দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ায় আদালত মোট ৬১ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করেন। সাক্ষ্যপ্রমাণ এবং উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শুনানি শেষে বৃহস্পতিবার রায় ঘোষণা করা হয়।
রায়ে প্রধান আসামি আকবর হোসেন ভূঁইয়াকে মৃত্যুদণ্ড, দুই আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং অপর তিন আসামিকে সাত বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।