ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম তিন অধিবেশন পরিচালনায় সরকারের ব্যয় হয়েছে প্রায় ৭০৩ কোটি টাকা। ৬০ কার্যদিবসে সংসদ অধিবেশন বসার হিসাবে প্রতি মিনিটে গড় ব্যয় দাঁড়ায় ৩ লাখ ৫৬ হাজার ৮২৫ টাকা। অর্থাৎ প্রতি সেকেন্ডে ব্যয়ের পরিমাণ প্রায় ৫ হাজার ৯৪৭ টাকা।
প্রথম অধিবেশন শুরু হয় ১২ মার্চ এবং শেষ হয় ৩০ এপ্রিল। এতে সংসদ বসে ২৫ কার্যদিবস। এরপর ৭ জুন থেকে ১৫ জুলাই পর্যন্ত চলে দ্বিতীয় বা বাজেট অধিবেশন, যেখানে কার্যদিবস ছিল ২৬ দিন। তৃতীয় অধিবেশন শুরু হয় ২৭ আগস্ট এবং শেষ হয় ১০ সেপ্টেম্বর; এতে কার্যদিবস ছিল নয়টি।
সংসদ সচিবালয়ের অধিবেশন পরিচালনার সম্মিলিত সময়ের হিসাব না থাকলেও অধিবেশন শুরুর ও শেষের সময় এবং বিভিন্ন বিরতি বিবেচনায় গড় অধিবেশনকাল ধরা হয়েছে প্রায় ৫ ঘণ্টা ৪৭ মিনিট। সে হিসাবে তিন অধিবেশনে মোট সময় দাঁড়ায় প্রায় ৩২৮ ঘণ্টা ২০ মিনিট বা ১৯ হাজার ৭০০ মিনিট।
প্রতি মিনিটে ৩ লাখ ৫৬ হাজার ৮২৫ টাকা ব্যয়ের হিসাবে মোট ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ৭০২ কোটি ৯৫ লাখ টাকা।
রাষ্ট্রপতির ভাষণের আলোচনায় ব্যয় ৮৬ কোটি
চলতি বছরের ১২ মার্চ জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের বর্ষ শুরুর ভাষণের ওপর আলোচনা হয় ৪০ ঘণ্টা ১৪ মিনিট। এতে অংশ নেন ২৮০ জন সংসদ সদস্য।
প্রতি মিনিটের গড় ব্যয় ধরে শুধু এই আলোচনাতেই সরকারের খরচ হয়েছে প্রায় ৮৬ কোটি ১৪ লাখ টাকা। এ সময় জামায়াত-এনসিপি জোটের সদস্যরা সংসদে বিক্ষোভ করে রাষ্ট্রপতির ভাষণ বর্জন করেন। পরে ভাষণের ওপর সাধারণ আলোচনার জন্য ৫০ ঘণ্টা সময় বরাদ্দের প্রস্তাবও তাদের পক্ষ থেকে আসে।
বাজেট আলোচনায় ব্যয় ১০৪ কোটি টাকা
দ্বিতীয় অধিবেশনে বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনা হয়েছে ৪৮ ঘণ্টা ৫১ মিনিট। এতে ৩১৬ জন সংসদ সদস্য অংশ নেন। মোট ২ হাজার ৯৩১ মিনিটের এই আলোচনায় গড় ব্যয়ের হিসাবে সরকারের খরচ হয়েছে প্রায় ১০৪ কোটি ৫৯ লাখ টাকা।
তবে সংসদের সব কার্যক্রমকে অপ্রয়োজনীয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। প্রশ্নোত্তর, আইন প্রণয়ন, সংসদীয় কমিটির কাজ, নোটিশ নিষ্পত্তি, প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা সংসদের নিয়মিত দায়িত্বের অংশ।
এর পাশাপাশি দীর্ঘ বিতর্ক, ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক আক্রমণ এবং অপ্রাসঙ্গিক বক্তব্যেও সংসদের সময় ব্যয় হওয়ার বিষয়টি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
বিল পাস হলেও আইন প্রণয়নে সময় কম
ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে ৯৪টি বিল পাস এবং ১৩৩টি অধ্যাদেশ উত্থাপন করা হয়। প্রধানমন্ত্রীকে করা ৯৩টি প্রশ্নের মধ্যে ৩৫টির উত্তর দেওয়া হয়। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীদের জন্য পাওয়া ২ হাজার ৫০৯টি প্রশ্নের মধ্যে উত্তর দেওয়া হয়েছে ১ হাজার ৭৭৮টির।
বাজেট অধিবেশনে পাস হয়েছে ১০টি সরকারি বিল। তৃতীয় অধিবেশনের নয় কার্যদিবসে ছয়টি বিল উত্থাপন ও পাস হয়। একই সময়ে বিভিন্ন সংসদীয় কমিটি গঠন ও পুনর্গঠন করা হয়েছে।
তবে মাত্র নয় কার্যদিবসে ছয়টি বিল উত্থাপন ও পাসের বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালও বিল দ্রুত সংসদে পাঠানোর বিষয়ে নির্বাহী বিভাগের সমালোচনা করেছেন। তার মতে, মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর সংসদ সদস্যদের বিল পড়া ও পর্যালোচনার জন্য পর্যাপ্ত সময় দেওয়া প্রয়োজন।
সময়ের সঙ্গে বাড়ছে সংসদ পরিচালনার ব্যয়
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) বিভিন্ন গবেষণার হিসাব অনুযায়ী, অষ্টম জাতীয় সংসদে প্রতি মিনিটে ব্যয় ছিল প্রায় ৩৫ হাজার টাকা। নবম সংসদের আটটি অধিবেশনে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৭৮ হাজার টাকা।
দশম সংসদের ১৪তম থেকে ১৮তম অধিবেশনে প্রতি মিনিটের গড় ব্যয় ছিল ১ লাখ ৬৩ হাজার ৬৮৬ টাকা। একাদশ সংসদের প্রথম ২২ অধিবেশনে এই ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ৭২ হাজার ৩৬৪ টাকা।
২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মূল্যস্ফীতির প্রভাব সমন্বয় করলে ওই ব্যয় বর্তমান হিসাবে ৩ লাখ ৫৬ হাজার ৮২৫ টাকায় দাঁড়ায়।
২০২৬-২৭ অর্থবছরে জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের প্রস্তাবিত মোট বাজেট ২৯০ কোটি ৬০ লাখ টাকা। এর মধ্যে পরিচালন ব্যয়ের জন্য ২৮৯ কোটি ৯০ লাখ এবং উন্নয়ন খাতে ৭০ লাখ টাকা রাখা হয়েছে।
সংসদ ভবনের রক্ষণাবেক্ষণেও বড় ব্যয়
জাতীয় সংসদ ভবনের রক্ষণাবেক্ষণেও প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় হয়। বিশ্বখ্যাত স্থপতি লুই আই কানের নকশায় নির্মিত ভবনটির ভৌত ও ইলেকট্রোমেকানিক্যাল রক্ষণাবেক্ষণে বিশেষ প্রকল্পসহ কোনো কোনো বছর ৫০০ কোটি টাকা পর্যন্ত ব্যয়ের তথ্য রয়েছে।
এর বাইরে নিরাপত্তা, বিদ্যুৎ, অগ্নিনিরাপত্তা, সম্প্রচার, গণপূর্তের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্ব ও ওভারটাইমসহ আরও বিভিন্ন খাতে অর্থ ব্যয় হয়।
সংসদ বিষয়ক গবেষক ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমদের মতে, আইন প্রণয়নে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া জরুরি। বিলের প্রতিটি ধারা পর্যালোচনা এবং সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে বিস্তারিত পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ থাকলে আরও কার্যকর ও টেকসই আইন তৈরি সম্ভব।
জাতীয় সংসদের অবসরপ্রাপ্ত পরিচালক কামরুল ইসলাম বলেন, সংসদের বার্ষিক বাজেটকে শুধু অধিবেশনভিত্তিক ব্যয়ের সঙ্গে তুলনা করলে প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাবে না। নিরাপত্তা, রক্ষণাবেক্ষণ, সম্প্রচার, বিদ্যুৎসহ অন্যান্য সেবার ব্যয়ও হিসাবের মধ্যে রাখতে হবে। তবে কোন দপ্তরে কত টাকা এবং কোন অধিবেশনে কত ব্যয় হয়েছে, তার সমন্বিত হিসাব এখনো করা হয়নি।
কালের কণ্ঠ