পোশাকশ্রমিকদের নতুন ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের প্রক্রিয়া শুরু করেছে সরকার। এ লক্ষ্যে গঠিত মজুরি বোর্ডের প্রথম সভা বুধবার (৪ নভেম্বর) বেলা ১১টায় শুরু হয়েছে। পূর্বনির্ধারিত সময় বিকেল ৩টার পরিবর্তে চার ঘণ্টা এগিয়ে সভা আয়োজন করা হয়।
শ্রমিকদের টানা আন্দোলন, বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে সংঘর্ষ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির মধ্যে সভার সময় পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সংশোধিত নোটিশে এ তথ্য জানানো হয়।
মজুরি বোর্ডের সচিবের স্বাক্ষরে প্রকাশিত নোটিশ অনুযায়ী, বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ১৩৯ ধারা অনুসারে গার্মেন্টস শিল্পে নিয়োজিত সব শ্রেণির শ্রমিক ও কর্মচারীর ন্যূনতম মজুরির হার সুপারিশ করার লক্ষ্যে এ সভা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বোর্ডের চেয়ারম্যান জ্যেষ্ঠ জেলা ও দায়রা জজ শেখ আশফাকুর রহমানের সভাপতিত্বে বৈঠকটি হওয়ার কথা রয়েছে।
সভায় বোর্ডের সদস্যদের পরিচিতি, পোশাকশ্রমিক ও কর্মচারীদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের সুপারিশ প্রণয়ন এবং বিবিধ বিষয় নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
এদিকে ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে বুধবারও গাজীপুরসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে গাজীপুর মহানগরীর বড়বাড়ী এলাকায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন পোশাকশ্রমিকেরা।
এ সময় শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষ হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। পরে বিক্ষোভকারীরা বাসন থানায় হামলার চেষ্টা করেন এবং থানার ভেতরে ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ওই এলাকায় অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়।
গাজীপুর শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার আমজাদ হোসাইন জানান, সকাল থেকে অধিকাংশ এলাকায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও বড়বাড়ী এলাকায় একটি বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। সেখানে পর্যাপ্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।
গত কয়েক দিন ধরে গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া, মিরপুর ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে বিক্ষোভ করছেন শ্রমিকেরা। মঙ্গলবার গাজীপুরের ভোগড়া, নাওজোর, মৌচাক ও পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষে অন্তত ৩০ জন আহত হন। এ সময় ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয়।
বর্তমানে পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা। তবে মূল্যস্ফীতি, বাড়িভাড়া ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ার বিষয়টি তুলে ধরে শ্রমিকেরা এই মজুরি বাড়িয়ে ৩০ হাজার টাকা করার দাবি জানাচ্ছেন।
শ্রমিকদের আশঙ্কা, মজুরি বোর্ডের সুপারিশে তাঁদের প্রত্যাশা অনুযায়ী বেতন বৃদ্ধি নাও হতে পারে। এ কারণে দ্রুত নতুন মজুরি কাঠামো চূড়ান্ত করার দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন তাঁরা।
গত ১ নভেম্বর সরকার নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করে। বোর্ডের চেয়ারম্যান করা হয়েছে শেখ আশফাকুর রহমানকে। মালিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে রয়েছেন আসিফ আইয়ুব ও এ বি এম শামসুদ্দিন। শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন আনোয়ার হোসেন ও বাবুল আখতার। আর স্বাধীন সদস্য হিসেবে রয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ।
শ্রমিক প্রতিনিধিরা দ্রুত সভা করে মজুরি নির্ধারণের প্রক্রিয়া শুরুর দাবি জানিয়ে আসছিলেন। তাঁদের প্রত্যাশা, ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন মজুরি কাঠামো চূড়ান্ত করা সম্ভব হবে এবং জানুয়ারি থেকে শ্রমিকেরা নতুন হারে বেতন পাবেন।
নতুন মজুরি নির্ধারণে বোর্ডের প্রথম সভা শুরু হওয়ায় শ্রমিকদের মধ্যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। চলমান অসন্তোষ নিরসনে বোর্ড কত দ্রুত সুপারিশ চূড়ান্ত করতে পারে, এখন সেদিকেই নজর শ্রমিক ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর।