‘আমি তোর সঙ্গে যাব রে, ও সোনার বাজান রে’—অসুস্থ মায়ের এমন আকুতির পরও তাঁকে নিজের সঙ্গে রাখতে রাজি হননি ছেলে। মাকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়লেও সিদ্ধান্তে অনড় থাকেন তিনি। মায়ের ভরণপোষণের খরচ দিতে আপত্তি নেই, কিন্তু তাঁকে নিজের সঙ্গে রাখা সম্ভব নয়—এমনটাই জানিয়েছেন ছেলে সাগর হোসেন।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) পাবনার সাঁথিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে মা-ছেলের বিরোধ নিয়ে শুনানির সময় এ ঘটনা ঘটে। পরে তাঁদের কথোপকথনের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
শুনানিতে ইউএনও সেলিম আহমেদ বিভিন্নভাবে সাগরকে বোঝানোর চেষ্টা করেন। তবে মাকে নিজের সঙ্গে রাখতে রাজি হননি তিনি। একপর্যায়ে সাগর বলেন, মাকে সঙ্গে রাখতে হলে আত্মহত্যা করা ছাড়া তাঁর আর কোনো উপায় থাকবে না।
৫৫ বছর বয়সী মুন্নি খাতুনের একমাত্র ছেলে সাগরের বয়স ৩২ বছর। তাঁর বাবা সিরাজুল ইসলাম অনেক আগেই মারা গেছেন। সাগর সাঁথিয়া উপজেলার নাগডেমরা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) গ্রাম পুলিশ হিসেবে কর্মরত। বর্তমানে মুন্নি খাতুন স্বামীর রেখে যাওয়া বাড়িতে না থেকে মেয়ের বাড়িতে বসবাস করছেন।
স্থানীয় ও পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, মা-ছেলের বিরোধের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের পারিবারিক অশান্তি ও অভিমান। সাগরের বিয়ের পর থেকে তাঁর স্ত্রী ও মায়ের মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়েন শুরু হয়। পরে এ বিরোধে সাগরের বোনও মায়ের পক্ষ নেওয়ায় পারিবারিক অশান্তি আরও বাড়ে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা একাধিকবার সমাধানের চেষ্টা করলেও বিরোধ মেটেনি।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও এলাকাবাসীর তথ্য অনুযায়ী, মুন্নি খাতুনের নিজের নামেও প্রায় ১০ লাখ টাকার জমি রয়েছে। মা ও ছেলে—দুজনেরই জমিজমা আছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, তাঁদের বিরোধের মূল কারণ আর্থিক সংকট নয়; বরং একসঙ্গে থাকা নিয়ে পারিবারিক দ্বন্দ্ব ও অভিমান।
নাগডেমরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাফিজুর রহমান জানান, দীর্ঘদিন ধরে তিনি মা-ছেলের বিরোধ মেটানোর চেষ্টা করছেন। বৃহস্পতিবার শুনানির পর শুক্রবারও সাগরের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলেছেন।
চেয়ারম্যানের ভাষ্য অনুযায়ী, সাগর তাঁকে জানিয়েছেন, বিয়ের পর থেকে তাঁর স্ত্রী ও মায়ের মধ্যে বনিবনা হচ্ছিল না। এ নিয়ে বিরোধ বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে সাগরের বোনও মায়ের পক্ষ নিয়ে পারিবারিক দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন। এসব ঘটনার পর মুন্নি খাতুন বিভিন্ন জায়গায় অভিযোগ করেন। একপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে অভিযোগ করার পর সাগরকে ডেকে নিয়ে মারধর করা হয়েছিল বলে চেয়ারম্যানের কাছে অভিযোগ করেছেন সাগর। এরপর থেকে মায়ের প্রতি তাঁর অভিমান আরও বেড়েছে বলে জানান চেয়ারম্যান।
হাফিজুর রহমান বলেন, মায়েরও কিছু ভুল থাকতে পারে। তবে একমাত্র ছেলে হিসেবে মাকে নিজের কাছে রাখতে না চাওয়ার বিষয়টি তিনি মেনে নিতে পারছেন না। সাগরকে বুঝিয়ে বিরোধের সমাধান করতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
শুনানি শেষে সাংবাদিকদের সাগর বলেন, প্রয়োজনে মায়ের খরচ দেবেন, কিন্তু নিজের সঙ্গে রাখা সম্ভব নয়। এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য জানতে পরে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
সাঁথিয়ার ইউএনও সেলিম আহমেদ জানান, প্রায় এক সপ্তাহ আগে মুন্নি খাতুন ও তাঁর মামা লিখিত আবেদন করেন। আবেদনে ওই নারী অভিযোগ করেন, ছেলে তাঁকে বাড়িতে রাখেন না এবং ভরণপোষণও দেন না। অসুস্থ অবস্থায় জীবনের বাকি সময় ছেলের সঙ্গে কাটানোর ইচ্ছার কথাও জানান তিনি। ওই আবেদনের ভিত্তিতে সাগরকে শুনানিতে হাজির হওয়ার নোটিশ দেওয়া হয়।
ইউএনও বলেন, শুনানিতে সাগরকে মা-বাবার ভরণপোষণসংক্রান্ত আইন সম্পর্কে জানানো হয়েছে। পাশাপাশি মানবিক ও ধর্মীয় দিক বিবেচনায় মায়ের দায়িত্ব নেওয়ার জন্য অনুরোধ করা হয়। দীর্ঘ সময় বোঝানোর পরও তিনি মাকে নিজের সঙ্গে রাখতে রাজি হননি। তবে মায়ের যাবতীয় খরচ বহন করতে সম্মতি জানিয়েছেন।
সেলিম আহমেদের মতে, এ বিরোধের মূল কারণ আর্থিক সংকট নয়, বরং মানসিক ও পারিবারিক টানাপোড়েন। মুন্নি খাতুন ভরণপোষণের অর্থের চেয়ে ছেলের সঙ্গে বসবাস করাকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। অন্যদিকে সাগর খরচ দিতে রাজি হলেও মাকে একই বাড়িতে রাখতে চান না। কেন তিনি এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তা জানতে একাধিকবার চেষ্টা করেও স্পষ্ট কারণ পাওয়া যায়নি বলে জানান ইউএনও।
তিনি আরও জানান, মুন্নি খাতুন বিভিন্ন সরকারি ভাতা ও সহায়তা পান। আর্থিক অসচ্ছলতা থাকলে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহযোগিতার বিষয়টি বিবেচনা করা যেত। কিন্তু তাঁর মূল চাওয়া ছেলের সঙ্গে থাকা। শুনানি শেষে সাগর মাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেছিলেন বলেও উল্লেখ করেন ইউএনও। তাই মায়ের প্রতি তাঁর কোনো অনুভূতি নেই—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না বলে মনে করেন তিনি।
আপাতত সাগরের ওপর চাপ না দিয়ে কিছুদিন পর মা-ছেলেকে আবারও শুনানিতে ডাকার পরিকল্পনা রয়েছে উপজেলা প্রশাসনের। কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে তাঁদের বিরোধের সমাধান করা যায় কি না, সে চেষ্টা করা হবে বলে জানিয়েছেন ইউএনও।