বাংলাদেশ রেলওয়েতে মিটারগেজ লোকোমোটিভের তীব্র সংকটে কনটেইনার, জ্বালানি ও খাদ্যশস্যসহ বিভিন্ন পণ্য পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে। এ সংকট কাটিয়ে মালবাহী ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক করতে বহরে নতুন ৮০টি লোকোমোটিভ যুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে রেলপথ মন্ত্রণালয়।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) জাতীয় সংসদ ভবনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের রেলপথ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির দ্বিতীয় বৈঠকে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এ তথ্য জানানো হয়।
বৈঠকে জানানো হয়, নতুন ৩০টি মিটারগেজ লোকোমোটিভ সংগ্রহের প্রকল্পের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) অনুমোদিত হয়েছে। এ ছাড়া আগে অনুমোদিত আরও ৩০টি লোকোমোটিভ সংগ্রহের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। আগামী ২০২৯ সালের মধ্যে এই ৬০টি লোকোমোটিভ সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে।
এর পাশাপাশি বিশ্বব্যাংকের ‘গ্রিন রেলওয়ে’ প্রকল্পের আওতায় আরও ২০টি মিটারগেজ লোকোমোটিভ সংগ্রহের কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন। সব মিলিয়ে রেলের বহরে ৮০টি নতুন ইঞ্জিন যুক্ত হলে কনটেইনার, জ্বালানি ও খাদ্যশস্যসহ বিভিন্ন পণ্যবাহী ট্রেনের সংখ্যা বাড়বে বলে আশা করছে মন্ত্রণালয়। এতে রেলের রাজস্ব আয়ও বাড়তে পারে।
বৈঠকে মোংলা বন্দর থেকে পণ্য পরিবহনের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়। মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়, এ বন্দর থেকে রেলপথে পণ্য পরিবহনের চাহিদা এখনো সীমিত। বর্তমানে মোংলা থেকে টাঙ্গাইলের সয়দাবাদ ও জয়পুরহাটে সীমিত পরিসরে মোলাসেস পরিবহন করা হচ্ছে। এর বাইরে বড় পরিসরে অন্য পণ্য পরিবহনের চাহিদা নেই।
যাত্রী পরিবহনের ক্ষেত্রে ৯৫/৯৬ নম্বর ট্রেনটি মোংলা-বেনাপোল রুটে নিয়মিত চলাচল করছে। তবে মোংলা-ঢাকা রুটে সরাসরি ট্রেন চালুর সিদ্ধান্ত নতুন ব্রডগেজ কোচ সংগ্রহের ওপর নির্ভর করছে।
রেলওয়ের বহরে পর্যায়ক্রমে ২০০টি ব্রডগেজ কোচ যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে। এর মধ্যে ১৮টি কোচ ইতোমধ্যে দেশে পৌঁছেছে। বাকি কোচগুলো পাওয়া গেলে মোংলা-ঢাকা রুটে নতুন ট্রেন চালুর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
রেলের অনলাইন টিকিট বিক্রিতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার বিষয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়। বর্তমানে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সহজ ডটকম রেলের অনলাইন টিকিট বিক্রি ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছে। আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে রেলওয়ের বিদ্যমান চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে।
চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই নতুন সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান নিয়োগের জন্য দরপত্র আহ্বারের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে বলে সংসদীয় কমিটিকে জানানো হয়। নতুন প্রতিষ্ঠান নিয়োগের প্রক্রিয়ায় যেন অনলাইন টিকিট ব্যবস্থাপনা ব্যাহত না হয়, সে বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বৈঠকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের বাজেট বাস্তবায়নের অগ্রগতি এবং রেলের অপারেটিং রেশিও পর্যালোচনা করা হয়।
এ ছাড়া রেলওয়ের মোট জমি, ব্যবহৃত ও ইজারাকৃত জমির পরিমাণ, ইজারা থেকে আয়, ইজারা গ্রহীতাদের তালিকা, অবৈধ দখল এবং জমি-সংক্রান্ত মামলার তথ্য উপস্থাপন করা হয়। রেলের জমি ও স্থাপনায় সৌরবিদ্যুতের প্যানেল স্থাপনের সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হয়।
বৈঠক শেষে রেলওয়েকে ধীরে ধীরে লোকসান থেকে বের করে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেয় সংসদীয় কমিটি।
এ ছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ লেভেল ক্রসিংয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ, রেলওয়ের আইন বিভাগে অভিজ্ঞ আইনজীবী নিয়োগ এবং দীর্ঘদিন ধরে আদালতে বিচারাধীন মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিতে বলা হয়।
যাত্রীদের সুবিধার্থে ভাঙ্গা থেকে বরিশাল পর্যন্ত নতুন রেললাইন নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাই এবং বেনাপোল-খুলনা রুটে প্রতিদিন সকালে কমিউটার ট্রেন চালুর জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনাও দেওয়া হয়।
পাবনা-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ আলি আসগারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে কমিটির সদস্য ও রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ, মো. আব্দুল মহিত তালুকদার, ইসরাত সুলতানা ইলেন ভূট্টো এবং মুহাম্মদ আজীজুর রহমান অংশ নেন।
এ সময় রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব, অতিরিক্ত সচিব, বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।