নেত্রকোনার দুর্গাপুর সীমান্ত থেকে ময়মনসিংহ হয়ে ঢাকায় মাদক ও চোরাই পণ্য পরিবহনের অন্যতম পথ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে ঝারিয়া–ময়মনসিংহ রেলপথ। সীমান্তবর্তী সড়কগুলোতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি থাকলেও রেলপথে পর্যাপ্ত তল্লাশির অভাবকে কাজে লাগাচ্ছে চোরাকারবারি চক্র—এমন অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দা ও নিয়মিত যাত্রীদের।
অভিযোগ রয়েছে, ভারতীয় মদ, কম্বল, প্রসাধনসামগ্রী, শাড়ি ও চিনিসহ বিভিন্ন পণ্য সীমান্ত এলাকা থেকে ট্রেনে তুলে ময়মনসিংহসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। এসব পণ্য পরিবহনে যাত্রীবেশে সক্রিয় রয়েছে সংঘবদ্ধ চক্র।
বর্তমানে ঝারিয়া–ময়মনসিংহ রেলপথে প্রতিদিন পাঁচটি ট্রেন চলাচল করে। এর মধ্যে ময়মনসিংহ থেকে চারটি লোকাল ট্রেন এবং ঝারিয়া থেকে ঢাকাগামী বলাকা কমিউটার রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, এসব ট্রেনের যাত্রীবাহী বগিগুলোই চোরাই পণ্য পরিবহনে ব্যবহার করা হচ্ছে।
স্থানীয় পর্যায়ের অনুসন্ধানসংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, দুর্গাপুর সীমান্ত থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও মোটরসাইকেলে বিভিন্ন পণ্য ঝারিয়া ঝাঞ্জাইল রেলস্টেশনে আনা হয়। পরে সুযোগ বুঝে বস্তাবন্দি মালামাল যাত্রীবাহী ট্রেনে তুলে দেওয়া হয়।
চোরাকারবারিরা একই বগিতে সব মালামাল না রেখে বিভিন্ন বগির আসনের নিচে ও লাগেজ রাখার স্থানে ছড়িয়ে রাখেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে এসব পণ্যের আশপাশে সংশ্লিষ্ট কেউ অবস্থান করেন না। ফলে মালামালের প্রকৃত মালিক শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ট্রেন শ্যামগঞ্জ, গৌরীপুর কিংবা ময়মনসিংহ জংশনে পৌঁছালে চক্রের সদস্যরা নির্দিষ্ট সংকেতে মালামাল নামিয়ে নিয়ে যান।
বিশেষ করে ময়মনসিংহের আউটার সিগন্যালে ট্রেন থামলে অথবা স্টেশনে প্রবেশের আগে গতি কমলে মালামাল নিচে ফেলে দেওয়ার ঘটনাও ঘটে বলে স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য। পরে চক্রের অন্য সদস্যরা সেগুলো সংগ্রহ করে নিয়ে যান।
স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এভাবে চোরাই পণ্য পরিবহন চললেও কার্যকর নজরদারি ও নিয়মিত তল্লাশি নিশ্চিত করা হচ্ছে না।
সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কতিপয় অসাধু ব্যক্তির সঙ্গে চোরাকারবারিদের যোগসাজশ রয়েছে বলেও এলাকায় অভিযোগ শোনা যায়। তবে এ অভিযোগের পক্ষে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ কিংবা সংশ্লিষ্ট কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থা নেওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি।
গৌরীপুর রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর (আরএনবি) ইনচার্জ আব্দুল মালেক বলেন, তাঁদের প্রধান দায়িত্ব রেলওয়ের স্থাপনা পাহারা দেওয়া। ট্রেনের ভেতরের নিরাপত্তা ও তল্লাশির বিষয়টি মূলত রেলওয়ে পুলিশ (জিআরপি) দেখে থাকে। তবে প্রয়োজন অনুযায়ী দুই বাহিনী সমন্বয় করে কাজ করে।
তিনি জানান, স্টেশনে আরএনবির জনবল কম। পাশাপাশি তিনি সম্প্রতি সেখানে যোগদান করেছেন।
শীত মৌসুমে চোরাচালান বৃদ্ধির আশঙ্কা বিবেচনায় নিয়ে অপরাধ প্রতিরোধে সর্বোচ্চ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান তিনি।
ময়মনসিংহ জিআরপি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আক্তার হোসেন বলেন, কমিউটার ট্রেনে নিয়মিত পুলিশ সদস্য থাকেন না। তবে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে একাধিক অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে এবং উদ্ধার করা মালামাল আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ময়মনসিংহ স্টেশনে ট্রেন পৌঁছানোর পর ঘিরে তল্লাশি চালানো হয়। গৌরীপুরেও অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। তবে এসব অভিযানে এখন পর্যন্ত কোনো মাদক পাওয়া যায়নি; পরিত্যক্ত অবস্থায় কম্বল উদ্ধার করা হয়েছে।
ট্রেনের ভেতরে নজরদারির দায়িত্ব প্রসঙ্গে ওসি বলেন, সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালন করতে হবে। যাঁরা মালামাল বুকিং দেন, তাঁদেরও পণ্য বৈধ কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন। আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব জিআরপির বলে জানান তিনি।বি
স্থানীয় বাসিন্দা ও নিয়মিত যাত্রীদের দাবি, সীমান্তবর্তী এই রেলপথের স্টেশনগুলোতে নিয়মিত তল্লাশি এবং চলন্ত ট্রেনে জিআরপি ও আরএনবির যৌথ টহল বাড়ানো প্রয়োজন।
বিশেষ করে ঝারিয়া ঝাঞ্জাইল, শ্যামগঞ্জ, গৌরীপুর ও ময়মনসিংহ জংশনে নজরদারি জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন তাঁরা।
তাঁদের মতে, ট্রেনে মালামাল ওঠানো থেকে শুরু করে গন্তব্যে নামানো পর্যন্ত কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা গেলে চোরাচালান প্রতিরোধে সুফল পাওয়া সম্ভব।
তবে এই রুটে মাদক পরিবহনের অভিযোগ থাকলেও জিআরপি জানিয়েছে, তাদের পরিচালিত অভিযানে এখন পর্যন্ত কোনো মাদক উদ্ধার হয়নি। ফলে অভিযোগগুলোর প্রকৃত বিস্তার ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে আরও অনুসন্ধান প্রয়োজন।