মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকথা হিসেবে আলোচিত জিয়াউর রহমানের লেখা ‘স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতি’ এবার পাঠ্যবইয়ের অংশ হচ্ছে। ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে নবম-দশম শ্রেণির ‘বাংলা সাহিত্য’ বইয়ে নিবন্ধটি নতুন অধ্যায় হিসেবে যুক্ত করার চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটি (এনসিসিসি)।
একই সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের সময়ের জিয়াউর রহমানের একটি ঐতিহাসিক ডায়েরির ছবিও পাঠ্যবইয়ে সংযোজনের উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)।
এনসিটিবির চেয়ারম্যান প্রফেসর মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা বাসসকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে নবম-দশম শ্রেণির ‘বাংলা সাহিত্য’ বইয়ে নিবন্ধটি অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে এনসিসিসি চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে। যার যতটুকু অবদান, তা নিরপেক্ষভাবে পাঠ্যবইয়ে তুলে ধরার লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে শিক্ষাবিদ ও বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। জাতীয় অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ মনে করেন, নিবন্ধটির ঐতিহাসিক মূল্য রয়েছে এবং এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা স্বাধীনতার সংগ্রাম সম্পর্কে জানতে পারবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক শাহ শামীম আহমেদও বলেন, নিবন্ধটি পাঠ্যবইয়ে যুক্ত হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাগুলো সম্পর্কে জানার সুযোগ পাবে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত ২৪ আগস্ট মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এনসিসিসির সভায় এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এনসিটিবির কারিকুলাম সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, নবম-দশম শ্রেণির ‘বাংলা সাহিত্য’ বইয়ের ২২ নম্বর গদ্যের লেখক পরিচিতিতে জিয়াউর রহমানকে মহান স্বাধীনতার ঘোষক, সাবেক রাষ্ট্রপতি, সেনাপ্রধান, জেড ফোর্সের অধিনায়ক, ১ নম্বর সেক্টর কমান্ডার ও ‘বীর উত্তম’ হিসেবে উল্লেখ করা হবে।
প্রস্তাবিত অংশে মুক্তিযুদ্ধকে সর্বাত্মক ‘জনযুদ্ধ’ হিসেবে বর্ণনা করে ২৫ মার্চের গণহত্যার পর শেখ মুজিবুর রহমান গ্রেপ্তার হলে তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণাকে মুক্তিকামী মানুষের জন্য ‘তুর্যধ্বনির মতো’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
মূল নিবন্ধ শুরুর আগে দেওয়া ব্যাখ্যায় ১৯৭২ সালে ‘দৈনিক বাংলা’য় প্রকাশিত ‘একটি জাতির জন্ম’ এবং ১৯৮০ সালে অধুনালুপ্ত ‘দৈনিক দেশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতি’কে মুক্তিযুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
সেখানে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা কোনো একক ব্যক্তি বা দলের কৃতিত্ব নয়। স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, মওলানা ভাসানী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদকে অনিবার্য নাম হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
নিবন্ধের বর্ণনায় ১৯৭১ সালের মার্চে চট্টগ্রাম থেকে সশস্ত্র বিদ্রোহের সূচনা, কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা এবং সম্মুখসমরের বিভিন্ন ঘটনার স্মৃতিচারণ রয়েছে।
চট্টগ্রামে পাকিস্তানি বাহিনীর গতিবিধি, ২৫-২৬ মার্চের রাতের পরিস্থিতি এবং ‘উই রিভোল্ট’ বলার মধ্য দিয়ে প্রতিরোধে যাওয়ার বর্ণনাও এতে রয়েছে। পরে ২৬ মার্চ রাত ২টা ১৫ মিনিটে সশস্ত্র স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরুর স্মৃতিও নিবন্ধে তুলে ধরা হয়েছে।
পটিয়ার পাহাড়ে প্রথম মুক্তাঞ্চল গঠন এবং ইপিআরের সদস্যদের সঙ্গে যোগ দেওয়ার ঘটনাও বর্ণনা করেছেন জিয়াউর রহমান। পাশাপাশি চট্টগ্রামে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রথম সম্মুখসমরের কথাও রয়েছে।
কালুরঘাটের স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের প্রসঙ্গও নিবন্ধের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ২৭ মার্চ সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় রেডিও স্টেশনে গিয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রথম ঘোষণার কথা লেখার এবং তা বেতারে প্রচারের স্মৃতিচারণ করেছেন জিয়াউর রহমান।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক বলেন, এনসিসিসির সভায় নিবন্ধটি সর্বসম্মতিক্রমে অনুমোদন পেয়েছে। তার ভাষ্য, এর মাধ্যমে নতুন প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারবে।