রাজধানীতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মিছিল, জমায়েত কিংবা অপতৎপরতা ঠেকাতে থানার পর্যায়েই কঠোর দায়িত্ব বণ্টন করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। কোনো থানা এলাকায় এমন ঘটনা ঘটলে সংশ্লিষ্ট ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এবং জোনের উপ-পুলিশ কমিশনারকে (ডিসি) জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হবে বলে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সোমবার (১৪ ডিসেম্বর) ডিএমপির মাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভা বা ক্রাইম কনফারেন্সে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের এ বিষয়ে কঠোর বার্তা দেওয়া হয়।
সভায় কর্মকর্তাদের বলা হয়, কোনো মিছিল বা জমায়েত হয়ে যাওয়ার পর অভিযান চালিয়েই দায়িত্ব শেষ করা যাবে না। সম্ভাব্য ঝুঁকি শনাক্ত করে আগেই গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে ঢাকার প্রবেশপথ, গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ও রাতের চেকপোস্টে নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
গুলশানে সম্প্রতি কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিলের বিষয়টি সভায় বিশেষ গুরুত্ব পায়। ডিএমপির গোয়েন্দা গুলশান বিভাগের উপকমিশনার আ ফ ম আনোয়ার হোসেন খান জানান, ওই ঘটনায় কোনো নির্দিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাকে এককভাবে দায়ী করা হয়নি। বরং আগাম তথ্যের ঘাটতি, প্রস্তুতির সীমাবদ্ধতা এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা কীভাবে প্রতিরোধ করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
সভায় জানানো হয়, গত শুক্রবার গুলশানের মিছিলের তথ্য পুলিশ একটি গোয়েন্দা সংস্থার কাছ থেকে মাত্র আট মিনিট আগে পেয়েছিল। খবর পাওয়ার পর গুলশান থানা পুলিশ দ্রুত তৎপর হলেও এত অল্প সময়ে বড় জমায়েত মোকাবিলায় প্রস্তুতির সীমাবদ্ধতা নিয়ে আলোচনা হয়।
ডিএমপির কর্মকর্তারা জানান, কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় নিষিদ্ধ সংগঠনের মিছিল বা অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে শুধু গোয়েন্দা সংস্থার ওপর দায় চাপানো যাবে না। সংশ্লিষ্ট থানার ওসি এবং জোনের ডিসিকেই স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের প্রাথমিক দায়িত্ব নিতে হবে। দায়িত্বে গাফিলতি বা অপারেশনাল ঘাটতি পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনার কথাও জানানো হয়েছে।
ক্রাইম ডিভিশনের এক কর্মকর্তা জানান, ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ স্পষ্ট করেছেন—কোনো ইউনিট বা কর্মকর্তা দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে সেখানে পরিবর্তন আনা হবে। দায়িত্বে গাফিলতি বা অপেশাদার আচরণ বরদাশত করা হবে না।
আগাম প্রতিরোধের পাশাপাশি গোয়েন্দা সমন্বয় বাড়ানোর ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে। ডিজিএফআই, এনএসআই, সিটিএসবি এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও তথ্য বিনিময়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সম্ভাব্য মিছিল, জমায়েত বা নাশকতার তথ্য পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা সংশ্লিষ্ট মাঠ ইউনিটকে জানিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
তবে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মিছিল ঠেকানোর নামে যেন নিরপরাধ কেউ হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়েও সতর্ক করেছে ডিএমপি। শুধু কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে অতীতে সম্পৃক্ততা বা সমর্থনের পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে গ্রেপ্তার না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মিছিলে সরাসরি অংশগ্রহণের প্রমাণ হিসেবে ছবি, ভিডিও ও প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণসহ সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আইনগত ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
একজন থানার ওসি জানান, সরাসরি মিছিলে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে ছবি ও ভিডিও বিশ্লেষণকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে গ্রেপ্তারের ভয় দেখিয়ে কোনো পুলিশ সদস্য আর্থিক সুবিধা নিলে তার বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে।
সভায় ‘প্রিভেন্টিভ পুলিশিং’ বা অপরাধ সংঘটনের আগেই তা প্রতিরোধের কৌশল নিয়েও বিস্তারিত নির্দেশনা দেওয়া হয়। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করা, সম্ভাব্য অপরাধীদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ এবং আগাম তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আবাসিক ও অন্যান্য হোটেলে অবস্থানকারী অতিথিদের তথ্য নিয়মিত সংগ্রহ ও সংরক্ষণের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
বাসাবাড়িতে নতুন ভাড়াটিয়ার পাশাপাশি পুরোনো ভাড়াটিয়াদের তথ্য হালনাগাদ করার কথাও বলা হয়েছে। বিশেষ করে সন্দেহজনক সাবলেট, অস্থায়ী আবাস এবং নতুন করে ঢাকায় আসা ব্যক্তিদের বিষয়ে স্থানীয় পর্যায়ে নজরদারি বাড়াতে বলা হয়েছে।
কমিউনিটি পুলিশিং নিয়েও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ওসিদের স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, গণ্যমান্য ব্যক্তি, কমিউনিটি পুলিশিংয়ের সদস্য ও নাগরিকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখার কথা বলা হয়েছে, যাতে কোনো এলাকায় অপরিচিত ব্যক্তির আনাগোনা বা সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড দেখা দিলে দ্রুত পুলিশকে জানানো যায়।
থানায় ওসিদের উপস্থিতি নিয়েও সভায় কঠোর অবস্থান জানানো হয়। সম্প্রতি তেজগাঁও ও পল্টন থানায় পরিদর্শনের সময় সংশ্লিষ্ট ওসিদের না পাওয়ার বিষয়টি আলোচনায় আসে। পরে তেজগাঁও থানার ওসি ক্যশৈন্যু মারমা এবং পল্টন মডেল থানার ওসি মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল খানকে প্রত্যাহার করা হয়।
ডিএমপির এক যুগ্ম কমিশনার জানান, দায়িত্ব পালনের সময়ে ওসিদের থানায় উপস্থিত থাকতে হবে এবং নির্ধারিত পোশাক পরতে হবে। জরুরি প্রয়োজনে থানার বাইরে গেলে জিডিতে বিষয়টি উল্লেখ করে দায়িত্ব পরবর্তী জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার কাছে বুঝিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া থানার শৃঙ্খলা ও পরিবেশ বজায় রাখার ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে। ছিনতাই ও কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার, অপরাধপ্রবণ এলাকায় নিয়মিত টহল এবং এলাকাভিত্তিক দায়িত্ব বণ্টনের নির্দেশ দেওয়া হয়, যাতে কোথাও নিরাপত্তার শূন্যতা তৈরি না হয়।
গুলশানের মিছিলের ঘটনায় ডিবি ও থানা পুলিশের যৌথ অভিযানে প্রায় ৫০ থেকে ৭০ জনকে গ্রেপ্তারের তথ্যও সভায় উঠে আসে। গ্রেপ্তারদের মধ্যে ঢাকার বাইরের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা ব্যক্তিরাও রয়েছেন। বগুড়া, গোপালগঞ্জ, আলফাডাঙ্গা ও হরিরামপুরসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা কয়েকজন ঢাকায় বিভিন্ন পেশায় যুক্ত ছিলেন। একটি চাইনিজ রেস্টুরেন্টের পাঁচজন ওয়েটারসহ নিরাপত্তাকর্মী ও অটোরিকশাচালকের মতো পেশায় থাকা ব্যক্তিদেরও শনাক্ত করার কথা জানানো হয়।
সব মিলিয়ে, রাজধানীতে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের যেকোনো ধরনের মিছিল বা অপতৎপরতা প্রতিরোধে আগাম গোয়েন্দা তৎপরতা, মাঠপর্যায়ের জবাবদিহি এবং তথ্য-প্রমাণভিত্তিক আইন প্রয়োগকে অগ্রাধিকার দিয়েছে ডিএমপি।