কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে টুপটুপ রেস্ট্রো অ্যান্ড রিসোর্টে আগুন লাগার পর প্রাণ বাঁচাতে দ্রুত বাইরে বেরিয়ে যান সেখানে কর্মরত ১৯ জন কর্মী। এ সময় রিসোর্টের দ্বিতীয় তলায় থাকা মালিকের পোষা দুটি কুকুর ও চারটি বিড়ালও কয়েকজন কর্মী বাইরে নিয়ে আসেন। তবে ভয়াবহ ওই অগ্নিকাণ্ডে ১০ পর্যটকের মৃত্যু হয়েছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন যশোরের একই পরিবারের চারজন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ৬টার দিকে রিসোর্টের রান্নাঘরে গ্যাসের চুলায় চা বসিয়ে এক কর্মী ঘুমিয়ে পড়েছিলেন বলে জানা গেছে। কিছুক্ষণ পর রান্নাঘর থেকে বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। এরপর প্রায় ১০ শতক জমির ওপর নির্মিত রিসোর্টটিতে দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়ে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও রিসোর্টের কর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, আগুন লাগার পর বেশির ভাগ কর্মী ও কয়েকজন অতিথি বেরিয়ে আসতে সক্ষম হন। তবে কয়েকজন কক্ষে আটকা পড়েন।
রিসোর্টের কাছের এক বাসিন্দা জানান, বিস্ফোরণের শব্দে তাঁর ঘুম ভেঙে যায়। বাইরে এসে তিনি রিসোর্টে আগুন জ্বলতে দেখেন। এ সময় কয়েকজন কর্মী কুকুর ও বিড়াল নিয়ে ছোটাছুটি করছিলেন। তাঁর ভাষ্য, রিসোর্টের মালিককে প্রায়ই পোষা কুকুর নিয়ে সমুদ্রসৈকতে হাঁটতে দেখেছেন।
গ্রেপ্তারের আগে রিসোর্টটির ম্যানেজার মোহাম্মদ সুমন সাংবাদিকদের জানান, আগুন লাগার সময় সেখানে ১৯ জন কর্মী ছিলেন। রিসোর্টের নয়টি কক্ষের মধ্যে ছয়টিতে অবস্থান করছিলেন ২১ জন অতিথি।
অগ্নিকাণ্ড ও প্রাণহানির ঘটনায় রিসোর্টের মালিক তানভীর সুলতান মিয়াকে প্রধান আসামি করে চারজনের নাম উল্লেখ করে উখিয়া থানায় মামলা করেছে পুলিশ। মামলায় তানভীরের ব্যবসায়িক অংশীদার নিয়াজ মোরশেদের নামও রয়েছে। এ ছাড়া ঘটনার দিন শনিবার সন্ধ্যায় আটক ম্যানেজার মোহাম্মদ সুমনকে মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। তদন্তের স্বার্থে আরেক আসামির নাম প্রকাশ করা হয়নি।
অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে তানভীর সুলতান মিয়া ও তাঁর ব্যবসায়িক অংশীদার নিয়াজ মোরশেদের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশের তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছেন উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২ সালের জুনে উখিয়ার ইনানী মৌজায় মেরিন ড্রাইভ-সংলগ্ন প্রায় ১০ শতক জমি কেনেন চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার বাসিন্দা টিপু সুলতান মিয়ার ছেলে তানভীর সুলতান মিয়া। পরে বন্ধু নিয়াজ মোরশেদকে সঙ্গে নিয়ে সেখানে টুপটুপ রিসোর্ট গড়ে তোলেন। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসায়িক কার্যক্রম শুরু হয়। রিসোর্ট ব্যবসার পাশাপাশি তানভীরের সার্ফনেট নামে ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানও রয়েছে।
অতিথিদের আকৃষ্ট করতে রিসোর্টে পোষা কুকুর-বিড়াল রাখার ব্যবস্থা করেছিলেন তানভীর। সেখানে কেনি নামের ইতালীয় প্রজাতির একটি কুকুর, কিয়ানা নামের জার্মান প্রজাতির আরেকটি কুকুর এবং পার্সিয়ানসহ বিভিন্ন বিদেশি প্রজাতির বিড়াল ছিল। প্রাণীগুলো লালন-পালনের পাশাপাশি কেনাবেচাও করা হতো বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জুনাইদ জানান, রিসোর্টটির অগ্নিনিরাপত্তার ছাড়পত্র ছিল না। গত জুনে পরিদর্শনের পর স্থাপনাটিকে অনিরাপদ উল্লেখ করে সতর্কতামূলক নোটিশ দেওয়া হয়েছিল।
তিনি বলেন, তিনতলা কাঠের ভবনটির নিচতলায় রেস্তোরাঁ এবং ওপরের দুই তলায় পর্যটকদের থাকার ব্যবস্থা ছিল। প্রয়োজনীয় অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা ও অনুমোদন ছাড়া এ ধরনের স্থাপনা পরিচালনা ঝুঁকিপূর্ণ।
কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কউক) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী জসিম উদ্দিনও জানান, রিসোর্টটির বৈধ অনুমোদন ছিল না। এ বিষয়ে নোটিশ দেওয়ার পরও প্রতিষ্ঠানটি সরিয়ে না নিয়ে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছিল।
অগ্নিকাণ্ডের কারণ ও সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো খতিয়ে দেখতে জেলা প্রশাসনের পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি কাজ করছে। মঙ্গলবারের মধ্যে কমিটিকে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক আব্দুল মান্নান।
এদিকে মামলার প্রধান আসামি তানভীরসহ অন্যদের গ্রেপ্তারে পুলিশ কাজ করছে বলে জানিয়েছেন উখিয়া থানার ওসি আতিকুর রহমান।