কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে বাংলাদেশের গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে আওয়ামী লীগপন্থি ভুয়া সংবাদ তৈরির একটি প্রচারণা নেটওয়ার্ক শনাক্ত করেছে এআই প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিক। এ ঘটনায় নেটওয়ার্কটির সঙ্গে যুক্ত ২৯টি ক্লড অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
অ্যানথ্রপিকের গত বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত ‘ডিটেক্টিং অ্যান্ড কাউন্টারিং মিসইউজ অব এআই: সেপ্টেম্বর ২০২৬’ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। সেখানে বাংলাদেশকেন্দ্রিক এই কার্যক্রমকে ‘জিটিজি-৫৪০০৬’ নামে চিহ্নিত করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গাইবান্ধা জেলার একজন ব্যক্তি প্রায় ১৬ মাস ধরে নেটওয়ার্কটি পরিচালনা করেন। নজরদারি ও ব্যবহারের সীমাবদ্ধতা এড়াতে তিনি পালাক্রমে ২৯টি ক্লড অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করতেন।
এ কাজে ‘ফেক_নিউজ_৩.পিওয়াই’ নামে একটি কাস্টম সফটওয়্যার ব্যবহার করা হয়। ক্লডের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ওই সফটওয়্যারের মাধ্যমে প্রতিটি ব্যাচে ১৫টি শিরোনাম, তিনটি বিস্তারিত বানোয়াট প্রতিবেদন এবং ১৫টি ছবি তৈরির প্রম্পট তৈরি করা হতো।
অ্যানথ্রপিক অন্তত সফটওয়্যারটির তৃতীয় সংস্করণ পর্যন্ত ব্যবহারের প্রমাণ পেয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির হিসাবে, পুরো কার্যক্রমে অন্তত ১ হাজার ৫০০টি শিরোনাম, ৩০০টি ভুয়া প্রতিবেদন এবং ১ হাজার ৫০০টি ছবি তৈরির নির্দেশনা প্রস্তুত করা হয়েছিল।
ক্লডে সরাসরি ছবি তৈরির সুবিধা না থাকায় এসব প্রম্পট অন্য কোনো এআই মডেলে ব্যবহার করে ছবি তৈরি করা হয়ে থাকতে পারে বলে প্রতিবেদনে ধারণা করা হয়েছে। তৈরি করা কনটেন্ট প্রথমে নির্দিষ্ট ক্লাউড স্টোরেজে জমা করা হতো। পরে সেগুলো অডিও-ভিডিওতে রূপান্তর করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশের জন্য প্রস্তুত করা হতো।
অ্যানথ্রপিক বলছে, এসব কনটেন্ট ফেসবুক লাইভ, ইউটিউব ও টিকটকে ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছিল। বিশেষ করে সীমিত শিক্ষার সুযোগ পাওয়া গ্রামীণ আওয়ামী লীগ সমর্থকদের লক্ষ্য করে কনটেন্টগুলো তৈরি করা হতো।
তদন্তে নেটওয়ার্কটির অভ্যন্তরীণ যোগাযোগের কিছু তথ্যও পাওয়া যায়। সেখানে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ইচ্ছাকৃতভাবে ভুয়া তথ্য ছড়ানোর কথা স্বীকার করেছেন বলে অ্যানথ্রপিক জানিয়েছে। কনটেন্টের ভাষা এমনভাবে তৈরি করা হতো, যাতে তা আক্রমণাত্মক হলেও সহজে বোঝা যায় এবং সত্য সংবাদ হিসেবে গ্রহণযোগ্য মনে হয়।
অ্যানথ্রপিকের বিশ্লেষণে নেটওয়ার্কটির প্রচারে চার ধরনের বয়ান বারবার উঠে এসেছে।
এর মধ্যে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টিকে (এনসিপি) তালেবান-ধাঁচের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং নিরাপত্তা বাহিনীতে অনুপ্রবেশের পরিকল্পনাকারী হিসেবে উপস্থাপন করা হতো।
এ ছাড়া তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার ও ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের বিরুদ্ধে হত্যার পরিকল্পনা এবং ঘাতক দলের মতো বানোয়াট গল্প প্রচার করা হয়েছে। জুলাই আন্দোলনের ছাত্রনেতাদের বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার এজেন্ট হিসেবেও তুলে ধরা হয়েছে।
বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর বিরুদ্ধে আর্থিক দুর্নীতি এবং গোপন জোটের মতো নানা অভিযোগও এসব কনটেন্টে প্রচার করা হতো।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নেটওয়ার্কটির একটি আলাদা স্ক্রিপ্ট ইউটিউবের এপিআই ব্যবহার করে একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক ভিডিও আপলোড করতে পারত। তৃতীয় পক্ষের একটি কনটিনিউয়াস ইন্টিগ্রেশন সেবার মাধ্যমে ভিডিওগুলো আগে থেকেই নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী প্রকাশ করা হতো। এতে মূল পরিচালকের আইপি ঠিকানাও আড়াল থাকত বলে জানিয়েছে অ্যানথ্রপিক।
অ্যানথ্রপিকের মূল্যায়ন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতার বাইরে থাকায় এই প্রচারণা সরকারের পক্ষ থেকে পরিচালিত হয়নি; বরং এটি একটি বিরোধী রাজনৈতিক অবস্থান থেকে পরিচালিত হয়েছে।
নেটওয়ার্কটির কিছু প্রচারণা ভারতপন্থি ভূরাজনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও এর পেছনে কোনো রাষ্ট্রীয় নির্দেশনা বা অর্থায়নের প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলেও জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
ফেসবুক, ইউটিউব ও টিকটক—তিন প্ল্যাটফর্মেই বাংলাদেশকেন্দ্রিক বিভিন্ন চ্যানেল ও প্রোফাইলে একই ধরনের ভিডিও পাওয়া গেছে। এ কারণে অ্যানথ্রপিক তাদের ‘ব্রেকআউট স্কেল’-এর তৃতীয় শ্রেণিতে রেখেছে। তবে পুরো কনটেন্ট কোন কোন চ্যানেলে প্রকাশিত হয়েছিল, তা নির্দিষ্টভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। এসব অ্যাকাউন্টের বাইরে আরও বড় পরিসরে কনটেন্ট ছড়িয়ে পড়ার প্রমাণও মেলেনি।
অভ্যন্তরীণ তদন্তের মাধ্যমে নেটওয়ার্কটি শনাক্ত করার পর সংশ্লিষ্ট সব ক্লড অ্যাকাউন্ট বন্ধ করেছে অ্যানথ্রপিক। একই ধরনের নতুন অ্যাকাউন্ট খোলার চেষ্টা ঠেকাতে নেটওয়ার্কটির আচরণগত বৈশিষ্ট্যও শনাক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অন্যান্য অংশীদার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রমাণ ভাগ করে নেওয়া হয়েছে।
সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে অ্যানথ্রপিক মোট নয়টি এআই অপব্যবহারের ঘটনা তুলে ধরেছে। এর মধ্যে বাংলাদেশই একমাত্র ঘটনা, যেখানে কোনো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নয়, বরং একজন ব্যক্তি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এআই ব্যবহার করে বড় পরিসরে ভুয়া কনটেন্ট তৈরির কার্যক্রম চালিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অ্যানথ্রপিকের মতে, এআইয়ের সহজলভ্যতা এখন ছোট গোষ্ঠী বা তুলনামূলক কম দক্ষ ব্যক্তিকেও বড় আকারের অপপ্রচার ও অন্যান্য ক্ষতিকর কার্যক্রম পরিচালনার সক্ষমতা দিচ্ছে। এ ধরনের ঝুঁকি মোকাবিলায় সরকার, গবেষক ও এআই প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে তথ্য বিনিময় এবং সমন্বিত নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন।