দেশের পল্লী স্বাস্থ্য কেন্দ্র থেকে শুরু করে মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত ধারণক্ষমতার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি রোগী মেঝেতে শুয়ে থাকার দৃশ্যকে অত্যন্ত লজ্জাজনক বলে অভিহিত করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ড. শফিকুর রহমান।
তিনি বর্তমান স্বাস্থ্য খাতকে কপি অ্যান্ড পেস্ট ও জোড়াতালির নীতিতে চলছে উল্লেখ করে বলেন, নতুন প্রজেক্টের চেয়ে বিদ্যমান জনবল ও লজিস্টিক সংকট দূর করে হসপিটালগুলোর মান ফিরিয়ে আনা এখন সবচেয়ে বড় জরুরি।
সোমবার (২৯ জুন) জাতীয় সংসদে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ এর সভাপতিত্বে প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
ড. শফিকুর রহমান বলেন, চলমান বাজেট অধিবেশনে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক সংকট, দুর্নীতি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের বেহাল দশা এবং অর্থ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। দেশের বাজেট হতে হবে ইনসাফভিত্তিক, যেখানে সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষ ও অঞ্চলের অধিকারকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। কিন্তু বর্তমান বাজেটে তার বড় ব্যতিক্রম লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সমাজে উন্নয়ন ও বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় বাধা হলো দুর্নীতি এবং জবাবদিহিতার অভাব। পদ্ধতিগতভাবে কোনো একটি এলাকা থেকে এই অসততা ও স্বচ্ছতার অভাব দূর করার উদ্যোগ নিলে তবেই জাতি এর সুফল পাবে। প্রযুক্তির সহায়তায় অন্তত ২০ দিন আগে যেখানে প্রাকৃতিক দুর্যোগের পূর্বাভাস পাওয়া যায়, সেখানে তিন মাস আগের সুনির্দিষ্ট পূর্বাভাসের মাধ্যমে বাজেটের অপচয় ও লুটপাটের সম্ভাবনা অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব।
শিক্ষাকে জাতির মেরুদণ্ড উল্লেখ করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা বর্তমানে বৈশ্বিক ন্যূনতম মানদণ্ড বজায় রাখতে পারছে না। ১৮ কোটি মানুষের এই দেশে অসংখ্য পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থাকলেও বিশ্ব র্যাংকিংয়ে আমাদের কোনো সম্মানজনক অবস্থান নেই, বরং আমরা দিন দিন পিছিয়ে যাচ্ছি। এর মূল কারণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ে আমাদের সুনির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্য বা মিশন নেই। দক্ষ ও যোগ্য মানুষকে সম্মান না দিয়ে বরাবরই রাজনৈতিক প্রাধান্য ও নিজেদের ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে লালন করার কারণে শিক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংসের মুখে পড়েছে। সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি দেশের কওমি মাদ্রাসা শিক্ষার বিশাল জনগোষ্ঠীর প্রতি বাজেটে কোনো বরাদ্দ বা বিবেচনা না থাকায় তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, সরকারি অনুদান নিলে শিক্ষার মৌলিকত্ব ক্ষুণ্ন হবে, কওমি ধারার এমন একটি আশঙ্কা রয়েছে। তাই সরকারের উচিত তাদের সম্মিলিত সংস্থা হাইয়াতুল উলইয়ার সাথে বসে নিশ্চয়তা দেওয়া যে, তাদের পরামর্শ মোতাবেকই এটি পরিচালিত হবে। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তাদের যে হক রয়েছে, তা বুঝিয়ে দেওয়া সরকারের দায়িত্ব। একইভাবে ইবতেদায়ী মাদ্রাসা এবং এমপিওভুক্তির অপেক্ষায় থাকা শিক্ষকদের বছরের পর বছর ঝুলিয়ে রেখে জুলুম না করে, রাজনৈতিক বিবেচনার বাইরে গিয়ে একটি নিরপেক্ষ কমিটির মাধ্যমে মান যাচাই করে দ্রুত এমপিওভুক্ত করার দাবি জানান তিনি।
উন্নত দেশের মতো বিত্তবানদের জন্য বেসরকারি শিক্ষা ব্যবস্থা থাকলেও সাধারণ মানুষের জন্য মানসম্মত সরকারি শিক্ষা নিশ্চিত করা পুরোপুরি রাষ্ট্রের দায়িত্ব হওয়া উচিত। এই লক্ষ্যে পাহাড়ের অনগ্রসর ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠীকে শিক্ষা, যোগাযোগ ও স্বাস্থ্য সেবার মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, তাদের ন্যায্য অধিকার হাতে তুলে দিলে পাহাড়ে আর কোনো দেশপ্রেমিক সেনা সদস্যকে প্রাণ হারাতে হবে না। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণাধর্মী করার ওপর জোর দিয়ে তিনি অন্তত পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশেষ অ্যাসাইনমেন্ট ও অতিরিক্ত ফান্ড দিয়ে গবেষণার কেন্দ্রবিন্দুতে রূপান্তর করার প্রস্তাব দেন, যাতে দেশ চিরকাল আমদানি-নির্ভর না থেকে নিজস্ব পণ্য রপ্তানির যোগ্যতা অর্জন করতে পারে।
অর্থনৈতিক সংস্কার ও রাজস্ব আদায়ের বিষয়ে ড. শফিকুর রহমান বলেন, সরকার নিজে সৎ এবং সদিচ্ছাসম্পন্ন হলে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি রাজস্ব আদায় সম্ভব। তবে এ ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের আশ্বস্ত করতে হবে যে তাদের তিন জায়গায় ট্যাক্স দিতে হবে না। বর্তমানে ব্যবসায়ীরা সরকারি কোষাগার ছাড়াও অসৎ কর্মকর্তা এবং চাঁদাবাজদের পকেটে কর দিতে বাধ্য হন। ব্যবসায়ীদের যদি নিশ্চয়তা দেওয়া হয় যে কর শুধু একটিই হবে এবং বিপদে রাষ্ট্র তাদের পাশে দাঁড়াবে, তবে সৎ ব্যবসায়ীরা স্বপ্রণোদিত হয়ে আরও বেশি কর দেবেন।
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, গত ১৫ বছরে মাত্র গুটি কয়েক অসৎ ও লুটেরা ব্যবসায়ীর হাতে দেশ লুণ্ঠিত হয়েছে, যাদের আমরা সবাই চিনি কিন্তু অনেকেই তাদের সাথে গলাগলি করি। বিগত সাড়ে ১৫ বছরে দেশ থেকে পাচার হওয়া ২৮ লক্ষ কোটি টাকা ফিরিয়ে আনার কোনো সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন এই বাজেটে নেই। পাচার হওয়া এই বিপুল অর্থের মাত্র নয় ভাগের এক ভাগ যদি আগামী অর্থ বছরে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়, তবে দেশে কোনো বাজেট ঘাটতি থাকবে না। শুধু অর্থ ফিরিয়ে আনাই যথেষ্ট নয়, বরং এই অপরাধীদেরও দেশে ফিরিয়ে এনে শাস্তির মুখোমুখি করতে হবে, অন্যথায় ভবিষ্যতে আরও বড় ডাকাত তৈরি হবে। এই প্রক্রিয়া যেন কচ্ছপ গতিতে না চলে, সেজন্য সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সাথে দ্রুত আইনি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই করার জোর তাগিদ দেন তিনি।
ক্ষমতার পালাবদল কখন কার মাধ্যমে হবে তা একমাত্র আল্লাহ ভালো জানেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশের স্বার্থে বিরোধী দল হিসেবে পাচার হওয়া টাকা ফিরিয়ে আনতে আন্তর্জাতিক মহলে যেকোনো ধরনের সহযোগিতা করতে তারা প্রস্তুত আছেন।