বাবাকে চুরির অভিযোগে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে মারধরের পর তাকে চা-রুটি খাওয়ানোর দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় আলোচনায় আসা ৯ বছরের তুবা বিনতে অরণি ও তার পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছে উজিরপুর উপজেলা প্রশাসন।
তুবার বাবা অনিক সরদারের ডোপ টেস্টে মাদক সেবনের উপস্থিতি পাওয়ার পর সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) তাকে বরিশাল নগরের একটি মাদক নিরাময় কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আলী সুজা এ তথ্য জানিয়েছেন।
ইউএনও জানান, নিউ লাইফ নামের ওই মাদক নিরাময় কেন্দ্রে অনিকের দুই থেকে তিন মাস চিকিৎসা চলবে। উপজেলা প্রশাসনের সহায়তায় তার চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়েছে কেন্দ্রটি।
অনিকের পরিবারের ভরণপোষণের ব্যবস্থাও করা হচ্ছে বলে জানান ইউএনও। তার স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস যাতে বাড়িতে থেকেই কাজ করে আয় করতে পারেন, সে বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তুবার পড়াশোনার ক্ষেত্রেও প্রশাসন সহযোগিতা করবে। ইউএনও জানান, তুবার স্কুলে গিয়ে শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে। তারা তার পড়াশোনায় বিশেষ নজর রাখবেন।
এ ছাড়া তুবার নামে একটি ব্যাংক হিসাব খোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দেশ-বিদেশের অনেকেই তাকে সহায়তা করতে আগ্রহ দেখিয়েছেন জানিয়ে ইউএনও বলেন, ভবিষ্যতে তার নামে স্থায়ী আমানত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত গত শুক্রবার রাতে পশ্চিম বামরাইল এলাকায়। স্থানীয়রা চুরির অভিযোগে অনিককে আটক করে বামরাইল বাজারে একটি খুঁটির সঙ্গে বেঁধে মারধর করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
পরদিন সকালে খবর পেয়ে সেখানে ছুটে যায় তার ৯ বছরের মেয়ে তুবা। বাবাকে বাঁধা অবস্থায় দেখে সে তাকে চা ও রুটি খাওয়ায়। পরে স্থানীয়রা অনিককে তার স্ত্রীর জিম্মায় ছেড়ে দেন। এ ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে।
তুবা জানায়, ঘটনাস্থলে গিয়ে সে বাবাকে বাঁধা অবস্থায় মারধর করতে দেখে। বাবাকে আর না মারার জন্য সে স্থানীয়দের অনুরোধ করে। পরে বাবার ক্ষুধা লাগায় চা ও রুটি খাওয়ায় তাকে।
তুবার ভাষ্য, বাবাকে ছাড়িয়ে নেওয়ার আগ পর্যন্ত সে ও তার মা সেখানে ছিলেন। ওই সময় তাদেরও না খেয়ে থাকতে হয়েছিল। পরে প্রশাসনের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে যাওয়ার পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।
তুবার মা জান্নাত বলেন, খবর পাওয়ার পর তারা ঘটনাস্থলে ছুটে যান। তুবা স্যান্ডেল পরার সময়ও না নিয়ে বাবার কাছে চলে যায়। মেয়ের সামনে বাবাকে মারধর করা হলে তুবা কাঁদতে কাঁদতে তাকে না মারার অনুরোধ করেছিল বলে জানান তিনি।
অন্যদিকে অনিক সরদার দাবি করেছেন, পূর্বশত্রুতা ও জমি নিয়ে বিরোধের জের ধরে তাকে চুরির অপবাদ দিয়ে নির্যাতন করা হয়েছে। তার কাছ থেকে কোনো চোরাই মালামাল উদ্ধার হয়নি এবং অভিযোগের পক্ষে প্রমাণও দেখানো হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।
অনিক বলেন, মেয়ের সামনে এভাবে বাঁধা অবস্থায় মারধরের শিকার হওয়ায় তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। এখন সবার সহযোগিতায় সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চান বলেও জানান তিনি।
উজিরপুর ইউএনও মো. আলী সুজা বলেন, ঘটনার খবর পেয়ে রোববার তুবার বাড়িতে গিয়ে পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। অনিক অসুস্থ থাকায় তার চিকিৎসার জন্য সোমবার মাদক নিরাময় কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। চিকিৎসা শেষে তিনি সুস্থ হয়ে পরিবারের কাছে ফিরবেন বলে আশা প্রকাশ করেন ইউএনও।
তিনি আরও জানান, অনিকের চিকিৎসাধীন সময়টিতে পরিবারের ভরণপোষণসহ প্রয়োজনীয় সহযোগিতায় উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সুশীল সমাজ পাশে থাকবে। এ সময় উজিরপুর উপজেলা বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি এসএম আলাউদ্দিন পরিবারটিকে নগদ অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করেছেন বলেও জানান ইউএনও।