জ্বালানি সংকটের মধ্যে গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস গ্যাসক্ষেত্রে নতুন তিনটি কূপ খনন করছে বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেড (বিজিএফসিএল)। এর মধ্যে ৩১ নম্বর কূপটি দেশের প্রথম ও সবচেয়ে গভীর অনুসন্ধান কূপ হিসেবে ৫ হাজার ৬০০ মিটার গভীরতায় খনন করা হচ্ছে।
নতুন ২৯, ৩০ ও ৩১ নম্বর কূপ থেকে আগামী ছয় মাসের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক গড়ে ৪০ থেকে ৪৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস যুক্ত করার আশা করছে বিজিএফসিএল। এর ফলে তিতাসের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ার পাশাপাশি আমদানিনির্ভর এলএনজির ওপর চাপও কিছুটা কমবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার নন্দনপুর এলাকায় চলছে ৩১ নম্বর কূপের খননকাজ। এর মাধ্যমে তিতাসের প্রচলিত ৩ হাজার ৭০০ মিটার গভীরতার সীমা পেরিয়ে আরও নিচে গ্যাসের উপস্থিতি অনুসন্ধান করা হচ্ছে।
চলতি বছরের ১৯ এপ্রিল ৩১ নম্বর কূপের ৫ হাজার ৬০০ মিটার গভীরতায় খনন শুরু হয়। এরই মধ্যে ৪ হাজার ৬৩৭ মিটার পর্যন্ত খনন সম্পন্ন হয়েছে। চলতি বছরেই কূপটির কাজ শেষ করে জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন অন্তত ১৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস যুক্ত করার প্রত্যাশা করছে বিজিএফসিএল।
বর্তমানে তিতাস গ্যাসক্ষেত্রের ২৩টি কূপ থেকে প্রতিদিন গড়ে ৩৩১ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন হচ্ছে। এসব কূপ থেকে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৭০০ মিটার গভীরতা পর্যন্ত গ্যাস উত্তোলন করা হয়। তবে পুরোনো কূপগুলোর মজুত ও চাপ কমে যাওয়ায় উৎপাদনও হ্রাস পেয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে উৎপাদন বাড়াতে ২৯, ৩০ ও ৩১ নম্বর কূপ খননের প্রকল্প হাতে নেয় বিজিএফসিএল। বর্তমানে ২৯ ও ৩১ নম্বর কূপের কাজ চলছে। ২৯ নম্বর কূপের কাজ শেষ হলে একই রিগ ব্যবহার করে ৩০ নম্বর কূপ খনন করা হবে।
গভীর অনুসন্ধান কূপ প্রকল্পের পরিচালক মো. মাহমুদুল নবাব বলেন, তিনটি কূপ সফলভাবে খনন করা গেলে সেখান থেকে গড়ে ৪০ থেকে ৪৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যেতে পারে।
তিনি জানান, ২৯ নম্বর কূপে ইতোমধ্যে ২ হাজার ৮৬০ মিটার খনন হয়েছে। কারিগরি জটিলতা না থাকলে আগামী দুই মাসের মধ্যে এর কাজ শেষ হতে পারে। এরপর ৩০ নম্বর কূপের খনন শুরু হবে। আর ৩১ নম্বর কূপের জন্য আরও তিন থেকে চার মাস সময় লাগতে পারে। সব মিলিয়ে তিনটি কূপ আগামী ছয় থেকে আট মাসের মধ্যে সম্পন্ন হওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছেন তিনি।
৩১ নম্বর কূপের গভীরতা নিয়ে প্রকল্প পরিচালক বলেন, তিতাসে এর আগে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৭০০ মিটার পর্যন্ত খনন করা হয়েছে। ১৯৬৯ সালে ওই গভীরতায় যাওয়ার সময় প্রায় ৩ হাজার ৬০০ মিটারে একটি উচ্চচাপের স্তরের মুখোমুখি হওয়ায় আরও গভীরে যাওয়া সম্ভব হয়নি।
বর্তমান জ্বালানি পরিস্থিতিতে এবার সেই সীমার নিচের স্তরে কী রয়েছে, তা জানার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সিসমিক জরিপের ভিত্তিতে ওই এলাকায় প্রায় দুই ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস থাকার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। তবে প্রকৃত মজুত সম্পর্কে নিশ্চিত হতে অনুসন্ধান কূপের খনন শেষ করতে হবে।
বিজিএফসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. আব্দুল জলিল প্রামানিক বলেন, আগামী ছয় মাসের মধ্যে তিনটি কূপ থেকে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহের আশা করছেন তারা।
তিনি বলেন, দৈনিক ৪৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস দেশের মোট চাহিদার তুলনায় খুব বড় পরিমাণ নয়। তবে এর অর্থনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে। কারণ এই পরিমাণ গ্যাস দেশে উৎপাদন করা গেলে সমপরিমাণ এলএনজি বিদেশ থেকে আমদানি করতে হবে না।
বিজিএফসিএল ব্যবস্থাপনা পরিচালকের ভাষ্য অনুযায়ী, দেশীয় উৎপাদন কোম্পানির কাছ থেকে সরকার প্রায় ১ টাকা ইউনিট মূল্যে গ্যাস নেয়। বিপরীতে এলএনজি আমদানি করতে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়। ফলে দেশীয় উৎপাদন বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয়ও সাশ্রয় হবে।
তিতাসের পাশাপাশি বিজিএফসিএল পরিচালিত অন্যান্য গ্যাসক্ষেত্রেও উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বন্ধ থাকা কূপে ওয়ার্কওভার এবং নতুন কূপ খননের প্রকল্প গ্রহণের কথাও জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
দেশের সবচেয়ে বড় গ্যাসক্ষেত্র তিতাস ১৯৬২ সালে পাকিস্তান শেল অয়েল কোম্পানি আবিষ্কার করে। এরপর ১৯৬৮ সালে এখানে বাণিজ্যিকভাবে গ্যাস উত্তোলন শুরু হয়। বর্তমানে পুরোনো কূপগুলোর উৎপাদন কমে আসার প্রেক্ষাপটে গভীর স্তরে নতুন গ্যাসের সন্ধানে এই খনন প্রকল্পকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।