কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে স্ত্রী, পাঁচ বছরের সন্তান, শ্যালক ও তিন শ্যালিকাকে হারিয়েছেন ওষুধ কোম্পানির কর্মকর্তা নূর আলম। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বেড়াতে গিয়ে এমন মর্মান্তিক ঘটনার মুখোমুখি হতে হবে, তা কল্পনাও করেননি তিনি। অগ্নিকাণ্ডের খবর পেয়ে খোঁজ নিতে গিয়ে জানতে পারেন, নিহত ছয়জনই তাঁর স্বজন।
নূর আলম চুয়াডাঙ্গায় ওষুধ কোম্পানি ড্রাগ ইন্টারন্যাশনালের জ্যেষ্ঠ বিপণন কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত। তিনি জানান, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কক্সবাজারে বেড়াতে গিয়েছিলেন। তবে পেশাগত কাজের প্রয়োজনে শুক্রবার তাঁকে চুয়াডাঙ্গায় ফিরতে হয়। শনিবার সকালে গণমাধ্যমে রিসোর্টে আগুন লাগার খবর দেখে স্বজনদের খোঁজ নেন। তখনই পরিবারের ছয় সদস্যের মৃত্যুর খবর পান।
শনিবার সকাল সাড়ে সাতটার দিকে কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীর পাটুয়ারটেক সৈকতসংলগ্ন টুপটুপ রিসোর্টে আগুন লাগে। কাঠের তৈরি রিসোর্টটিতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় মোট ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাঁদের মধ্যে একই পরিবারের ছয়জন রয়েছেন। নিহত বাকি তিনজনের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নূর আলমের নিহত স্বজনেরা হলেন তাঁর স্ত্রী ফারিয়া কবির (৩৩), পাঁচ বছর বয়সী ছেলে ফাইজান নূর, শ্যালক নাসির উদ্দিন (২৫) এবং তিন শ্যালিকা ইসরাত জাহান মালিহা (৩০), লায়লা জাহান নাবিলা (২৭) ও মিলিতা মেহেজাবিন আলভী (২৩)। নিহত আরেকজন নাফিসতা মীম (২৭)। নূর আলমের পরিবারের সদস্যদের বাইরে নিহত অন্য ব্যক্তিরা রাজধানীর বনশ্রী ও খিলগাঁও এলাকায় বসবাস করতেন।
অগ্নিকাণ্ডে দগ্ধ ছয়জন কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক শিহাব উদ্দীন (৩১) ও তাঁর স্ত্রী নাফিজা নেওয়াজ খান (২৯)। এ ছাড়া ইসমাইল হোসেন মাসুদ (৩০), তাঁর স্ত্রী মেহেরুন নেছা (২৭), মান্নান (৩৪) এবং সামিদা (৩২) আহত হয়েছেন।
আহত ইসমাইল হোসেন ও তাঁর স্ত্রী মেহেরুন নেছা নিহত ফারিয়া কবিরের মামা ও মামি। তাঁদের বাড়ি চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার দক্ষিণ ঠেটালিয়া গ্রামে। হতাহতদের স্বজন ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মো. আহাদ এসব তথ্য জানিয়েছেন।
নূর আলমের গ্রামের বাড়ি বরিশালের উজিরপুর উপজেলার বড়কোঠা ইউনিয়নের গাজিরপাড় গ্রামে। চাকরির কারণে প্রায় আট বছর ধরে তিনি চুয়াডাঙ্গায় থাকছেন। পেশাগত দায়িত্ব পালনের সুবিধার্থে স্ত্রী-সন্তানসহ চুয়াডাঙ্গা শহরের দক্ষিণ হাসপাতালপাড়ার একটি বাসায় ভাড়া থাকতেন।
নূর আলম জানান, গত বুধবার স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে চুয়াডাঙ্গা থেকে ঢাকায় যান। পরদিন বৃহস্পতিবার শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের সঙ্গে তাঁদের কক্সবাজারে বেড়াতে যাওয়ার কথা ছিল। এই ভ্রমণে নূর আলমের সঙ্গে তাঁর স্ত্রী-সন্তান, শ্যালক ও শ্যালিকারাও ছিলেন। পরে কাজের প্রয়োজনে তাঁকে ফিরে আসতে হলেও পরিবারের সদস্যরা কক্সবাজারে থেকে যান।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, শনিবার সকালে মেরিন ড্রাইভ সড়কসংলগ্ন টুপটুপ রিসোর্টে আগুন লাগার পর ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছান। পরে স্থানীয় লোকজন পুলিশের সহায়তায় আগুন নিয়ন্ত্রণ ও উদ্ধারকাজে অংশ নেন।
বেলা সোয়া দুইটার দিকে ফায়ার সার্ভিসের কক্সবাজারের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মোরশেদ হোসেন ১০ জনের মরদেহ উদ্ধারের তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, রিসোর্টে আরও মরদেহ থাকতে পারে। এ কারণে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত ছিল।
হতাহতদের স্বজন মো. আহাদ জানান, শনিবার সকালে তাঁদের সবার ঢাকার উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু অগ্নিকাণ্ডে একসঙ্গে এতজন স্বজনকে হারিয়ে পরিবারের সদস্যরা শোকে ভেঙে পড়েছেন। এই মৃত্যু মেনে নেওয়া তাঁদের জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।