ফেসবুকে পরিচয়ের সূত্র ধরে রাজু চৌধুরী (২০) নামের এক যুবকের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে কক্সবাজার গিয়েছিল কুমিল্লায় হত্যার শিকার সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিন (১৫)। রাজু কক্সবাজারের একটি আবাসিক হোটেলে চাকরি করেন। তাদের পরিচয় থেকে সম্পর্কের সময়কাল ছিল ১৭ দিন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তাজমিন চার দিন নিখোঁজ থাকার পর তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তবে তিনি ঠিক কবে কক্সবাজারে গিয়েছিলেন, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, প্রথমে তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যান। পরে কুমিল্লায় ফিরে সেখান থেকে কক্সবাজারে যান। বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় মাকে জানিয়েছিলেন, তিনি এক বান্ধবীর বাসায় যাচ্ছেন।
কক্সবাজার থেকে ফেরার পথে বুধবার (৭ অক্টোবর) রাতে কুমিল্লার পদুয়ারবাজার বিশ্বরোড এলাকার হোটেল নূরজাহানে নামেন তাজমিন। একটি সিসিটিভি ফুটেজে তাঁকে আইকনিক এক্সপ্রেসের বাস থেকে নামতে দেখা গেছে।
কক্সবাজারের কক্সেস প্যানারেমিক ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুর এজেন্সির আবদুল্লাহ শনিবার রাতে কালবেলাকে জানান, মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) রাত ৮টার পর তাজমিন ও রাজু তাঁদের কাউন্টারে বাসের টিকিট কাটতে আসেন। তখন তাঁদের সাধারণ যাত্রী হিসেবেই দেখেছিলেন তিনি। পরদিনের যাত্রার জন্য রাজু একটি টিকিট কাটেন। বুধবার দুপুর ১২টার দিকে আইকনিক এক্সপ্রেসের বাসটি কক্সবাজার থেকে কুমিল্লার উদ্দেশে ছেড়ে যায়। রাতে বাসটি হোটেল নূরজাহান এলাকায় পৌঁছায়।
হত্যাকাণ্ডের খবর প্রকাশের পর আবদুল্লাহ সিসিটিভি ফুটেজ ও ঘটনার তথ্য খতিয়ে দেখে মেয়েটিকে তাজমিন হিসেবে শনাক্ত করেন। পুলিশ তাঁর কাছে তথ্য জানতে চাইতে পারে—এমন ধারণা থেকে তিনি বিষয়টি নিয়ে খোঁজ নেন। পরে জানতে পারেন, তাজমিনের সঙ্গে থাকা রাজু হত্যাকাণ্ডে জড়িত নন। পুলিশ জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তি ছিলেন সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক মো. সুমন মিয়া (৩৫)।
তাজমিনের মা কেয়া খাতুন সাংবাদিকদের জানান, বৃহস্পতিবার বিকেলে মেয়ের সঙ্গে তাঁর শেষ কথা হয়। তখন তাজমিন বলেছিল, সে এক বান্ধবীর সঙ্গে আছে। মেয়েকে আনতে বান্ধবীর বাড়িতে যেতে চেয়েছিলেন তিনি। তবে বান্ধবীর নাম এবং তার মা-বাবার পরিচয় জানতে চাইলেও তাজমিন তা জানায়নি।
মেয়ের বন্ধুবান্ধব ও চলাফেরা নিয়ে আগে থেকেই উদ্বিগ্ন ছিলেন কেয়া খাতুন। কোনো অঘটন ঘটতে পারে—এমন আশঙ্কায় প্রায় ছয় মাস মেয়েকে স্কুলে যেতে দেননি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মেয়ের চলাফেরা ও বন্ধুত্বের বিষয়ে খোঁজ রাখার চেষ্টা করতেন তিনি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মেয়েকে রক্ষা করতে পারেননি।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তাজমিনের মায়ের সন্দেহের তালিকায় থাকা বান্ধবী তাঁর চেয়ে বয়সে বড়। তবে হত্যাকাণ্ডে ওই বান্ধবী বা তাঁর সংশ্লিষ্টদের সম্পৃক্ততার প্রমাণ এখনো মেলেনি বলে জানিয়েছেন তাঁরা। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, তাজমিন মোবাইল গেমে আসক্ত ছিল।
তাজমিনের শিক্ষক সাদ বিন এরশাদ জানান, তিনি দীর্ঘদিন তাজমিনকে পড়িয়েছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তাজমিন ছিল চঞ্চল স্বভাবের। মা অসুস্থ থাকলে সে তার যমজ ছোট দুই ভাইয়ের দেখাশোনা করত। তার বাবা একটি ওষুধ কোম্পানিতে চাকরি করতেন এবং কাজের কারণে সকালে বাসা থেকে বের হয়ে রাতে ফিরতেন। তবে বাবা মেয়েকে খুব আদর করতেন। রাগ হলে তাজমিন কখনো কখনো হুট করে বাড়ি থেকে বের হয়ে যেত বলেও জানান শিক্ষক।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, বুধবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে কক্সবাজার থেকে আসা বাস থেকে পদুয়ারবাজারের হোটেল নূরজাহান এলাকায় নেমে বাসায় ফেরার জন্য সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাড়া করে তাজমিন। গ্রেপ্তার অটোরিকশাচালক সুমন তাঁকে নির্জন স্থানে নিয়ে ধর্ষণের পর গলায় গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করেন বলে পুলিশ জানিয়েছে। সুমন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছেন।
পরদিন বৃহস্পতিবার সকালে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার জগতপুর গ্রামের একটি ধানখেত থেকে তাজমিনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
সচেতন নাগরিক কমিটি কুমিল্লার সাবেক সভাপতি শাহ মো. আলমগীর খান মনে করেন, রাজুর সঙ্গে সম্পর্ক না হলে তাজমিনের কক্সবাজার যাওয়া হতো না; সে ক্ষেত্রে হয়তো এমন বিপদের মুখে পড়তে হতো না তাঁকে।
সূত্র: কালবেলা