‘স্বপ্নের ঠিকানা’, ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ কিংবা ‘তোমাকে চাই’ সিনেমার মতো তুমুল জনপ্রিয় সিনেমার প্রয়াত চিত্রনায়ক চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন ওরফে সালমান শাহকে হারানোর ৩০ বছর আজ ৬ সেপ্টেম্বর।
১৯৭১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর সিলেটের দারিয়াপাড়ায় নানাবাড়িতে তাঁর জন্ম। শৈশবে ছায়ানটে সংগীতের তালিম নিয়েছিলেন। চলচ্চিত্রে আসার আগে বিজ্ঞাপনচিত্র ও টেলিভিশন নাটকে কাজ করেছিলেন তিনি।
১৯৯৩ সালে প্রথম সিনেমা ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ মুক্তির পর যেন রাতারাতি বদলে যায় তাঁর জীবন। প্রাণবন্ত অভিনয়, সংলাপ বলার সহজাত ধরন, পর্দায় স্বচ্ছন্দ উপস্থিতি ও সমকালীন ফ্যাশন তাঁকে অন্য নায়কদের থেকে আলাদা করে দেয়। প্রথম চলচ্চিত্রের সাফল্যেই তিনি হয়ে ওঠেন তরুণ দর্শকের নতুন নায়ক।
এরপর সালমান শাহকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। একের পর এক মুক্তি পায় ‘তুমি আমার’, ‘অন্তরে অন্তরে’, ‘সুজন সখী’, ‘বিক্ষোভ’, ‘দেনমোহর’, ‘স্বপ্নের ঠিকানা’, ‘বিচার হবে’, ‘এই ঘর এই সংসার’, ‘তোমাকে চাই’, ‘স্বপ্নের পৃথিবী’, ‘সত্যের মৃত্যু নেই’, ‘জীবন সংসার’, ‘চাওয়া থেকে পাওয়া’, ‘আনন্দ অশ্রু’ ও ‘বুকের ভেতর আগুন’।
সালমান শাহর ২৭টি চলচ্চিত্রের ১৩টিতেই নায়িকা ছিলেন শাবনূর। পর্দায় দুজনের রসায়ন দর্শকের কাছে এতটাই গ্রহণযোগ্য হয়েছিল যে নব্বইয়ের দশকের সবচেয়ে জনপ্রিয় জুটিগুলোর একটি হয়ে ওঠেন তাঁরা। তবে মৌসুমী, শাবনাজ, লিমা, শিল্পী ও সোনিয়াসহ সে সময়ের আরও কয়েকজন অভিনেত্রীর সঙ্গেও অভিনয় করেছিলেন সালমান।
সালমান শাহর জনপ্রিয়তা কেবল তাঁর চলচ্চিত্রের ব্যবসায়িক সাফল্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের নায়কের পোশাক, চুলের ধরন ও পর্দায় উপস্থিতি কেমন হতে পারে—সেটিরও নতুন একটি ধারণা তৈরি করেছিলেন তিনি। তাঁর জ্যাকেট, শার্ট, মাথার ক্যাপ কিংবা চুলের ছাঁট অনুসরণ করতেন তরুণেরা।
প্রেমিক চরিত্রের পাশাপাশি পারিবারিক গল্প, সামাজিক সংকট কিংবা প্রতিবাদী তরুণের ভূমিকাতেও দর্শক তাঁকে গ্রহণ করেছিলেন। একই সময়ে আবেগ, রোমান্স ও তারুণ্যের ভাষা পর্দায় তুলে ধরতে পারার কারণে তিনি হয়ে উঠেছিলেন নব্বইয়ের দশকের একটি প্রতীক।
সাড়ে তিন বছরের মধ্যে ২৭টি চলচ্চিত্রে অভিনয়ই বলে দেয়, সে সময় নির্মাতা ও প্রযোজকদের কাছে সালমান শাহর চাহিদা কতটা ছিল। মৃত্যুর পরও তাঁর অভিনীত কয়েকটি চলচ্চিত্র মুক্তি পায়। সেগুলোও প্রেক্ষাগৃহে দর্শক টেনেছিল।
১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ঢাকার ইস্কাটনের বাসা থেকে সালমান শাহর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তখন তাঁর বয়স মাত্র ২৪ বছর। তাঁর আকস্মিক মৃত্যু স্তব্ধ করে দিয়েছিল চলচ্চিত্র জগৎ ও অসংখ্য ভক্তকে। মৃত্যুর তিন দশক পরও তাঁকে ঘিরে স্মৃতিচারণা, আলোচনা ও বিতর্ক থামেনি।
এত বছরেও কেন সালমান শাহর জনপ্রিয়তা কমেনি—এর উত্তর হয়তো লুকিয়ে আছে তাঁর অসমাপ্ত যাত্রায়। দর্শকের চোখে তিনি কখনো বয়স বাড়াননি; পর্দায় চিরতরুণ হয়েই রয়ে গেছেন। তাঁর চলচ্চিত্রগুলো এখন ইউটিউব কিংবা টেলিভিশনে দেখা গেলেও বড় পর্দায় দেখার অভিজ্ঞতা অন্য রকম।
অমর নায়ক সালমান শাহর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষ্যে বিএফডিসি আয়োজন করেছে তিন দিনের চলচ্চিত্র প্রদর্শনী। তিন বিএফডিসির বড় পর্দায় চলবে ‘স্বপ্নের ঠিকানা’ থেকে ‘তোমাকে চাই’, এর মতো সারাজাগানো সব সিনেমা।
৬ সেপ্টেম্বর বিকেল চারটায় ‘স্বপ্নের ঠিকানা’ দিয়ে শুরু হবে সেই ফিরে দেখা। পরের দুই দিন পর্দায় আসবে ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ ও ‘তোমাকে চাই’। মৃত্যুর ৩০ বছর পর আবার আলো নিভবে মিলনায়তনে, পর্দা আলোকিত হবে, আর দর্শকের সামনে ফিরে আসবেন চিরতরুণ সালমান শাহ।