দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। শুক্রবার (২১ আগস্ট) সন্ধ্যায় বঙ্গভবনের দরবার হলে শপথগ্রহণের মধ্য দিয়ে তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে আসীন হওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই তার বেতন, রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা এবং সাংবিধানিক ক্ষমতা নিয়ে সাধারণ মানুষের আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
‘দ্য প্রেসিডেন্টস (রেমুনারেশন অ্যান্ড প্রিভিলেজ) (সংশোধন) অ্যাক্ট’ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির বেতন ও সুযোগ-সুবিধা নির্ধারিত হয়। বর্তমানে রাষ্ট্রপতির মাসিক বেতন ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। এ বেতন আয়করমুক্ত। তবে শুধু বেতন নয়, রাষ্ট্রপতি হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সরকারি বাসভবন, সরকারি গাড়ি ও পরিবহন সুবিধা, চিকিৎসাসেবা, বিদেশ সফরের ভাতা, আপ্যায়ন এবং বিমানভ্রমণসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা পাবেন।
রাষ্ট্রপতির পদটি দেশের সাংবিধানিক কাঠামোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদ। দায়িত্ব পালনের প্রয়োজনীয়তা ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদা বিবেচনায় রাষ্ট্রপতির জন্য এসব সুবিধা আইন ও বিধি অনুযায়ী নির্ধারিত রয়েছে।
রাষ্ট্রপতি হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কী কী বেতন ও রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা পাবেন, কোন সুবিধাগুলো কীভাবে প্রযোজ্য এবং রাষ্ট্রপতির জন্য নির্ধারিত অন্যান্য আর্থিক সুবিধাগুলো কী, তা কালবেলার পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।
সরকারি বাসভবন ও গাড়ি
রাষ্ট্রপতির সরকারি বাসভবন বঙ্গভবন। এর সাজসজ্জা, রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় অন্যান্য ব্যয় রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বহন করা হয়। রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের জন্য তিনি সরকারি গাড়ি ও প্রয়োজনীয় পরিবহন সুবিধা পান। বিদেশ সফরের ক্ষেত্রেও সরকার নির্ধারিত হারে ভাতা পাওয়ার বিধান রয়েছে।
বছরে ২ কোটি টাকার স্বেচ্ছাধীন তহবিল
রাষ্ট্রপতির জন্য রয়েছে স্বেচ্ছাধীন তহবিল। এ তহবিলে বছরে ২ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকে। রাষ্ট্রপতির বিবেচনায় বিভিন্ন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে সহায়তা দিতে এ অর্থ ব্যয় করা যায়।
রাষ্ট্রপতি ও পরিবারের বিনামূল্যে চিকিৎসা
রাষ্ট্রপতি ও তার পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসার জন্য বিশেষ সুবিধা রয়েছে। দেশের যে কোনো হাসপাতালে তারা বিনা মূল্যে চিকিৎসা নিতে পারেন। চিকিৎসকের পরামর্শে বিদেশে চিকিৎসার প্রয়োজন হলে সেই ব্যয়ও সরকার বহন করে।
বিমানভ্রমণে বছরে ২৭ লাখ টাকা
রাষ্ট্রপতির বিমানভ্রমণের জন্যও বিশেষ সুবিধা রয়েছে। বর্তমানে এ সুবিধার পরিমাণ বছরে ২৭ লাখ টাকা। ২০১৬ সালের আগে এ সুবিধা ছিল ১৫ লাখ টাকা।
অর্থাৎ মাসিক বেতনের বাইরে রাষ্ট্রপতির জন্য সরকারি বাসভবন, গাড়ি ও পরিবহন, চিকিৎসা, বিদেশ সফরের ভাতা, আপ্যায়ন এবং বিমানভ্রমণসহ নানা রাষ্ট্রীয় সুবিধা রয়েছে।
সাংবিধানিক ক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ
রাষ্ট্রপতির সুযোগ-সুবিধার পাশাপাশি তার সাংবিধানিক ক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ। সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, দুটি ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে বাধ্য নন। এগুলো হলো প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগ।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কোনো দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে সাধারণত ওই দলের সংসদীয় দলের নেতাকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করেন রাষ্ট্রপতি। তবে কোনো দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে না পারলে সরকার গঠনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রীয় ও পররাষ্ট্রনীতি-সংক্রান্ত বিষয় সম্পর্কে রাষ্ট্রপতিকে অবহিত রাখেন। রাষ্ট্রপতি কোনো বিষয় মন্ত্রিসভার বিবেচনার জন্য পাঠাতে চাইলে প্রধানমন্ত্রী তা মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করেন। তবে প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকে কোনো পরামর্শ দিয়েছেন কি-না বা দিয়ে থাকলে কী পরামর্শ দিয়েছেন, সে বিষয়ে কোনো আদালত তদন্ত করতে পারে না।
দণ্ড মার্জনা ও মওকুফের ক্ষমতা
রাষ্ট্রপতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ক্ষমতা হলো দণ্ড মার্জনা, স্থগিত, হ্রাস বা মওকুফ করা। সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা অন্য কর্তৃপক্ষের দেওয়া দণ্ড রাষ্ট্রপতি সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে মার্জনা, স্থগিত, হ্রাস বা মওকুফ করতে পারেন।
রয়েছে সাংবিধানিক দায়মুক্তি
দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক দায়মুক্তি রয়েছে। তার কার্যকাল চলাকালে তার বিরুদ্ধে কোনো আদালতে ফৌজদারি মামলা করা যায় না। তাকে গ্রেপ্তার বা কারাগারে পাঠানোর জন্য আদালত থেকে পরোয়ানাও জারি করা যায় না।
যদিও রাষ্ট্রপতি সম্পূর্ণভাবে অপসারণের বাইরে নন। সংবিধান লঙ্ঘন বা গুরুতর অসদাচরণের অভিযোগে সংসদীয় প্রক্রিয়ায় তাকে অভিশংসন করা যেতে পারে। শারীরিক বা মানসিক অসামর্থ্যের কারণেও তাকে অপসারণের বিধান রয়েছে।
অভিশংসনের ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যদের স্বাক্ষরযুক্ত অভিযোগ স্পিকারের কাছে জমা দিতে হয়। রাষ্ট্রপতিকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হয়। এরপর সংসদের মোট সদস্যের কমপক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে প্রস্তাব পাস হলে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হয়।
রাষ্ট্রপতির মেয়াদ পাঁচ বছর
বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির মেয়াদ পাঁচ বছর। তবে উত্তরাধিকারী দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত তিনি পদে বহাল থাকেন। একই ব্যক্তি সর্বোচ্চ দুই মেয়াদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করতে পারেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে আবদুল হামিদ পরপর দুই মেয়াদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেছেন।