মৃত মায়ের সরকারি পাওনা ১০ লাখ টাকা তুলতে এক লাখ টাকা ঘুষ দাবির অভিযোগ ওঠার পর ময়মনসিংহ সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ে তদন্ত শুরু হয়। দুই কর্মচারীকে শোকজ এবং তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার তিন দিনের মধ্যেই বদলি করা হয়েছে সংশ্লিষ্ট উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মনিকা পারভীনকে।
গত ৬ সেপ্টেম্বর দুই কর্মচারীর বিরুদ্ধে শোকজ-সংক্রান্ত তদন্ত প্রতিবেদন জমা পড়ে। এর তিন দিন পর, ৯ সেপ্টেম্বর প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের এক অফিস আদেশে মনিকা পারভীনকে ময়মনসিংহ সদর থেকে নান্দাইল উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হিসেবে পদায়ন করা হয়।
অফিস আদেশে বদলির কারণ হিসেবে শুধু ‘জনস্বার্থে’ উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ঘুষের অভিযোগ, কর্মচারীদের শোকজ, তদন্ত প্রতিবেদন জমা এবং এরপরই শিক্ষা কর্মকর্তার বদলি—এই ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
১৭ বছর বয়সী শাহেদ শরীফ আহমেদ অভিযোগ করেন, তার মা আমিনা খাতুন চাকরিরত অবস্থায় মারা যান। এরপর পরিবারের পাওনা হিসেবে কল্যাণ তহবিল থেকে দুই লাখ এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে আট লাখ—মোট ১০ লাখ টাকা পাওয়ার কথা ছিল।
শাহেদের দাবি, এই অর্থ পেতে ময়মনসিংহ সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা তাদের কাছে এক লাখ টাকা ঘুষ চান। ঘুষ না দিলে ফাইল এগোবে না বলেও জানানো হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
পরে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ‘ঘুষ.সাইটে’ বিষয়টি নিয়ে অভিযোগ করেন শাহেদ।
অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর গত ৩১ আগস্ট সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ের হিসাব সহকারী এ এইচ এম নাদিরুল হাসান সবুজ এবং অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর মুহাম্মদ মজিবুর রহমানকে শোকজ করা হয়।
শিক্ষা কর্মকর্তা মনিকা পারভীনের স্বাক্ষর করা শোকজ নোটিশে দুই কর্মচারীকে তিন কার্যদিবসের মধ্যে লিখিত জবাব দিতে বলা হয়। অভিযোগ খতিয়ে দেখতে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়।
উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. হারুন সিকদার জানান, তিনজনকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল এবং তদন্ত প্রতিবেদন গত ৬ সেপ্টেম্বর জমা দেওয়া হয়েছে। তবে প্রতিবেদন সম্পর্কে বিস্তারিত জানাতে রাজি হননি তিনি।
এরপর ৯ সেপ্টেম্বর প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন-২) মোছাম্মদ রোখসানা হায়দারের স্বাক্ষরে বদলির আদেশ জারি হয়। এতে মনিকা পারভীনকে ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে বর্তমান কর্মস্থলের দায়িত্ব বুঝিয়ে দিতে বলা হয়েছে। তা না হলে ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে তাকে তাৎক্ষণিকভাবে অবমুক্ত হিসেবে গণ্য করার কথা বলা হয়েছে।
তবে বদলির আদেশে ঘুষের অভিযোগ, তদন্ত কিংবা কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থার কথা উল্লেখ নেই। সেখানে কেবল ‘জনস্বার্থে’ বদলির কথা বলা হয়েছে।
নিজের বদলি প্রসঙ্গে মনিকা পারভীন বলেন, তার কার্যালয় নিয়ে সম্প্রতি আলোচনা তৈরি হয়েছে। তিনি দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের চেষ্টা করেছেন। তবে আদেশে জনস্বার্থে বদলির কথা থাকলেও এর নির্দিষ্ট কারণ তার জানা নেই।
ময়মনসিংহ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, সরকারি আদেশে যেকোনো কর্মকর্তাকে যেকোনো সময় বদলি করা হতে পারে। মনিকা পারভীনের বদলির পেছনে আলাদা কোনো কারণ রয়েছে কি না, তা তার জানা নেই।
ঘুষ.সাইটের অভিযোগ ও দুই কর্মচারীকে শোকজের সঙ্গে বদলির সম্পর্ক রয়েছে কি না—এ প্রশ্নে তিনি বলেন, এর কারণ ঘুষ.সাইটের অভিযোগ ও শোকজও হতে পারে। আবার নান্দাইলে যাওয়ার জন্য মনিকা পারভীন আবেদন করে থাকলেও এমনটি হতে পারে।
এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা দাবি করেন, শোকজের পর শিক্ষা কর্মকর্তা মনিকা পারভীন এবং শাহেদের বাবা শরীফুল ইসলাম শামীমের ওপর বিভিন্নভাবে চাপ প্রয়োগের খবর তারা পেয়েছেন। এসব চাপের কারণেও শিক্ষা কর্মকর্তার বদলি হয়ে থাকতে পারে বলে তার ধারণা।
শাহেদও নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কার কথা জানিয়েছেন। তার দাবি, ঘুষ.সাইট চালু করে আলোচনায় আসার পর বিভিন্ন মোবাইল নম্বর থেকে তাকে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে এখনো থানায় মামলা বা লিখিত অভিযোগ করেননি তিনি। পরে থানায় অভিযোগ করার কথা জানিয়েছেন শাহেদ।
সরকারি সেবা নিতে গিয়ে ঘুষ দাবির অভিজ্ঞতা থেকেই শাহেদ শরীফ আহমেদ ও সাইফ কবির নামে দুই তরুণ ‘ঘুষ.সাইট’ তৈরির উদ্যোগ নেন।
শাহেদের ভাষ্য, মৃত মায়ের সরকারি পাওনা তুলতে গিয়ে তার বাবাকে ঘুষ দিতে হয়েছিল। নিজের পাসপোর্ট তৈরির ক্ষেত্রেও ঘুষ দাবির অভিজ্ঞতা হয়েছিল তার। এসব অভিজ্ঞতা থেকেই সরকারি সেবা পেতে ঘুষ দিতে হবে কেন—এই প্রশ্ন সামনে রেখে দুর্নীতির অভিযোগ জানানোর অনলাইন প্ল্যাটফর্মটি তৈরি করেন তারা।
গত ২১ আগস্ট ওয়েবসাইটটি চালুর পর বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে দেশজুড়ে আলোচনা শুরু হয়। উদ্যোক্তাদের দাবি, চালুর পর অল্প সময়ের মধ্যেই এতে বিপুলসংখ্যক অভিযোগ জমা পড়ে এবং অভিযোগে দাবিকৃত ঘুষের অর্থের পরিমাণ কয়েকশ কোটি টাকা।
তবে ওয়েবসাইটে জমা পড়া প্রতিটি অভিযোগকে সত্য বলে দাবি করছেন না উদ্যোক্তারা। তাদের মতে, সরকারি সেবা নিতে গিয়ে ঘুষ দাবি বা ঘুষ দেওয়ার অভিযোগগুলো এক জায়গায় তুলে ধরার পাশাপাশি দুর্নীতিবিরোধী জনসচেতনতা তৈরিই এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।