‘চিন্তা কমাতেও চিন্তা করতে হয় মধ্যবিত্ত সন্তানদের’—২০২৩ সালের ৩ মে ফেসবুকে এমন আক্ষেপ লিখেছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার প্রবাসী যুবক নজরুল ইসলাম মাহিন। পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতির আশায় সাত লাখ টাকা ঋণ করে সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু প্রবাসজীবনের সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না। মক্কায় তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর প্রকাশের পর পুরোনো ফেসবুক পোস্টগুলো ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শোক প্রকাশ করছেন অনেকে।
নজরুলের ফেসবুক প্রোফাইল ঘেঁটে দেখা যায়, প্রবাসজীবনের শুরু থেকেই মধ্যবিত্ত পরিবারের টানাপোড়েন, স্বপ্ন ও বাস্তবতা নিয়ে লিখতেন তিনি। ২০২২ সালের ১৩ নভেম্বর দেশ ছাড়ার সময় বিমানবন্দরে তোলা ছবি পোস্ট করে লিখেছিলেন, ‘গুড বাই বাংলাদেশ’। একই পোস্টে সবার কথা মনে পড়ার কথা জানিয়ে নিজের জন্য দোয়া চেয়েছিলেন।
সৌদি আরবে যাওয়ার কিছুদিন পর, ওই বছরের ২৯ নভেম্বর তিনি লেখেন, ‘ভাব নেয়াটা আমাকে মানায় নাহ, কারণ আমি মধ্যবিত্ত।’ পরে ২০২৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি ঘাসের ওপর শুয়ে থাকা একটি ছবি পোস্ট করে লেখেন, ‘পকেটে টাকা থাকলে তোমরা দুনিয়া কিনতে পারবে।’
একপর্যায়ে মক্কার পবিত্র মসজিদুল হারামে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ পান নজরুল। ২০২৩ সালের ৮ মার্চ কাবা শরিফের সামনে নীল ইউনিফর্ম পরা নিজের একটি ছবি পোস্ট করে লেখেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ ক্লিনার মক্কা হেরাম শরিফ।’ তাঁর সেই পোস্টেও অনেকে শোক ও সমবেদনা জানাচ্ছেন।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের নভেম্বরে সৌদি আরবে যাওয়ার প্রায় ছয় মাস পর মক্কার একটি মসজিদে এক তরুণীর সঙ্গে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে নজরুলসহ দুজনকে গ্রেপ্তার করে দেশটির পুলিশ। তিন বছর তিন মাস কারাগারে থাকার পর গত ১৪ অক্টোবর তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় বলে পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার বিরামপুর গ্রামের চার ভাই-বোনের মধ্যে সবার বড় ছিলেন নজরুল। তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর শুনে ওই রাতেই হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তাঁর ফুফু আবেদা বেগম।
নজরুলের মা রহিমা বেগম জানান, কারাগারে থাকা অবস্থায় ছেলে প্রতি রোববার পরিবারের সঙ্গে কথা বলতেন। কিন্তু পরিবারকে কিছু না জানিয়েই তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। গণমাধ্যম ও ফেসবুকে প্রকাশিত খবরের মাধ্যমেই প্রথম ছেলের মৃত্যুর বিষয়টি জানতে পারেন তাঁরা।
নজরুলের বাবা আব্দুল বাছির বলেন, সাত লাখ টাকা ঋণ করে সংসারের হাল ধরতে ছেলেকে সৌদি আরবে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু যাওয়ার ছয় মাসের মধ্যেই ছেলে কারাগারে চলে যান। এর মধ্যে মাত্র দেড় লাখ টাকা পাঠাতে পেরেছিলেন নজরুল। এখন একদিকে ঋণদাতাদের চাপ, অন্যদিকে সন্তান হারানোর শোক সামলাতে হচ্ছে পরিবারটিকে। কী কারণে ছেলে কারাগারে ছিলেন, তা-ও তিনি জানতেন না বলে জানান। এখন অন্তত ছেলের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে চান তিনি।
দীর্ঘ সময় কারাগারে থাকার পরও পরিবারকে অবহিত করা এবং আইনি সহায়তার বিষয়ে বাংলাদেশ দূতাবাসের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও সামাজিক সংগঠকেরা। তাঁরা দ্রুত সরকারি উদ্যোগে নজরুলের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা এবং অসহায় পরিবারটির পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
হিউম্যান রাইটস ডিফেন্ডার্স সোসাইটির (এইচআরডিএস) ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মো. সুজন সরকার বলেন, প্রবাসে কাজ করতে গিয়ে কোনো বাংলাদেশি এভাবে মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি হওয়া দুঃখজনক। এ ঘটনায় বাংলাদেশ দূতাবাসের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তাঁর মতে, যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হলে হয়তো জীবন রক্ষার সুযোগ তৈরি হতে পারত।
সামাজিক সংগঠক শামীম আহমেদও দূতাবাসের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাঁর বক্তব্য, তিন বছরের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের দুই নাগরিক কারাগারে থাকার পরও দূতাবাস বিষয়টি জানত না—এমনটা কীভাবে সম্ভব, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। সৌদি আরবে বাংলাদেশি নারী কর্মীদের হয়রানি ও নির্যাতনের অভিযোগের বিষয়েও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
এ বিষয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক মো. আবু সাঈদ বলেন, প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি। পরিবারের পক্ষ থেকেও কোনো আবেদন করা হয়নি। মরদেহ দেশে এলে নিয়ম অনুযায়ী সহায়তা করা হবে।