একটা সময় চিঠিই ছিল সকল যোগাযোগের মাধ্যম । পরিবারের সদস্যদের সাথে যোগাযোগ বলি, ভালোবাসার মানুষের সাথে ভাব বিনিময় কিংবা আত্মীয়-স্বজনের সাথে ভাব আদান প্রদানের মাধ্যম ছিল চিঠি । সময়ের পরিবর্তনে চিঠি প্রায় হারিয়েই গেছে বলতে গেলে। পহেলা সেপ্টেম্বর বিশ্ব চিঠি দিবস। দিনটি আন্তর্জাতিক চিঠি দিবস হিসেবে স্বীকৃত। প্রযুক্তির কারণে হারিয়ে গেছে হাতে চিঠি লিখে খামে ভরে পোস্ট অফিসে পোস্ট করার দিন ।
ভাল আছি ভাল থেকো আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখো, এই গানের মতো করে কেউ কোনো দিন ভেবেছিলেন যে মানুষ একসময় শুধুই আকাশের ঠিকানায় অর্থাৎ অন্তর্জালে চিঠি লিখে যাবে! অন্তর্জালের ই-মেইল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের খুদে বার্তার ভেতর তলিয়ে গেছে চিঠির আবেদন। ছোট ছোট বাক্যে, কাট ছাঁটকৃত শব্দে বিন্যস্ত এই যোগাযোগ ব্যবস্থাকে ভাষাবিজ্ঞানীরা নাম দিয়েছেন ‘টেক্সটস্পিক’।
কারও সঙ্গে কথা বলা প্রয়োজন, চট করেই বাংলা-ইংরেজি মিশিয়ে ইনবক্সে পাঠানো যায়। চিঠিতে একটি আন্তরিক সম্বোধন থাকতো, চিঠির পরতে পরতে আবেগ থাকতো, না বলা কথা থাকতো, আর শেষে নিজের নাম স্বাক্ষর করার আগে লেখা থাকতো ‘ইতি তোমার’ বা ‘আপনার স্নেহধন্য …. । ডাক বিভাগে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগলেও দিন দিন কমেছে চিঠির সংখ্যা। গত ৫ বছরে ডাক বিভাগের চিঠি কমেছে অর্ধেক। শুধুমাত্র সরকারি কাজে ও অফিসিয়িাল ছাড়া ডাক বিভাগে আর ব্যক্তিগত চিঠি আসে না। চিঠি লেখা আসলেই এখন হারিয়ে যাওয়া শিল্প।
বর্তমানে দাপ্তরিক কাজের নথি বা আবেদনপত্রের জমাদান ছাড়া কেউ ডাকঘরে যে আর যায় না, সে কথা সবার জানা। একটা সময়ে দূরে থাকা আত্মীয় -স্বজনের সাথে যোগাযোগের মাধ্যমই ছিল চিঠি। এমনকি খুব কাছের কাউকে মুখে না বলতে পারা কথাগুলো সুন্দরভাবে সাজিয়ে নেওয়া হতো চিঠিতে। একটি চিঠিতে থাকতো টইটম্বুর আবেগ। শেরশাহের ঘোড়ার ডাক প্রচলনের আগে কীভাবে চিঠি আদান-প্রদান হতো, তা নিয়ে দ্বিমত থাকলেও আজকাল দাপ্তরিক কাজের নথি বা আবেদনপত্রের ঝক্কি ছাড়া কেউ ডাকঘরে যে আর যায় না, সে সবারই জানা। অথচ একসময়ে দূরে থাকা আপনজনের সঙ্গে যোগাযোগের একটি মাধ্যমই ছিল চিঠি। শুধু দূরে নয়, অন্তরের খুব কাছের কাউকে মুখে না বলতে পারা কথাগুলোও সযত্নে সাজিয়ে নেওয়া হতো চিঠিতে।
এক একটি চিঠিতে কত যে গল্প, কত যে ইতিহাস থাকত! আর থাকত ভরপুর আবেগ , উচ্ছ্বাস স্নেহ প্রেম ভালোবাসা। ডিজিটাল যুগে চিঠির প্রয়োজন ফুরিয়েছে, বিশেষত ব্যক্তিগত আদান প্রদানের মাধ্যম হিসেবে, এসএমএস থেকে শুরু করে বিভিন্ন অ্যাপের সাহায্যে চ্যাট, যোগাযোগের তাৎক্ষণিক মাধ্যম খুলে দিয়েছে, ফলে চিঠির আর প্রয়োজন হয় না। হাতে লেখা চিঠি তো দূর এমনকি ই-মেইলে লেখা ব্যক্তিগত চিঠিও প্রায় উঠেই যাচ্ছে। অথচ, টম হ্যাঙ্কস আর মেগ রায়ান অভিনীত জনপ্রিয় হলিউড সিনেমা ‘ইউ হ্যাভ গট আ মেইল’-কেও এখন অনেকে মনে করতে পারে ইতিহাস। চিঠি মানে কিন্তু শুধু চিঠি নয় তার অনেকটা বেশি। এ কথা অনেকে ভোলেননি, আর সেটা মনে রেখেই বিশ্ব চিঠি দিবসের শুরু। অস্ট্রেলীয় লেখক, শিল্পী ও ফটোগ্রাফার রিচার্ড সিম্পকিন এর যাত্রা শুরু করেন ২০১৪ সালে।
হাতে লেখা চিঠি পাওয়ার যে আনন্দ বা একটা চিঠি কাগজে কলমে লিখে তা খামে বন্দী করে পাঠানোর অনুভূতি যাতে হারিয়ে না যায়, তার জন্যই পহেলা সেপ্টেম্বর দিনটাকে চিঠি উদযাপনের দিন হিসেবে বেছে নেন সিম্পকিন। এই ডিজিটাল যুগে যখন মুঠোর ভিতর টেক্সটে, ভিডিওতে সবাইকে ধরে ফেলা যাচ্ছে, তখন আবার চিঠির মতো জিনিস নিয়ে ভাবার কারণ– চিঠি যে শুধু কেজো যোগাযোগ নয়, ওর মধ্যে রয়েছে আরো অনেক কিছু। চিঠি যোগাযোগের প্রয়োজন মিটিয়ে হয়ে উঠতে পারে অনেক কিছু। কখনো বাবা মেয়েকে লেখা চিঠি হয়ে উঠেছে পরবর্তীতে ইতিহাস ও দর্শনের শিক্ষামূলক বই, তো কখনো কোনো ব্যক্তিগত প্রেমপত্র হয়ে উঠেছে সাহিত্যের অমূল্যসম্পদ। কোনো কোনো চিঠি তৈরি করেছে একটা জাতির সাহিত্যের ভাষা, তো কোনো চিঠি তার রাজনৈতিক আন্দোলনের মর্মন্তুদ ইতিহাসের সাক্ষ্য।
ইতিহাসের যে চিঠিগুলো নিছক চিঠি নয়, যেগুলোর প্রভাব এখনো ব্যাপকভাবে বিদ্যমান, এমনই কিছু চিঠি সম্পর্কে কিছু তথ্য তুলে ধরছি। বেলফোর ঘোষণা (১৯১৭): ফিলিস্তিনে ইহুদি রাষ্ট্র স্থাপনের লক্ষ্যে যুক্তরাজ্যের ইহুদি কমিউনিটির নেতা লিওনেল ওয়াল্টার রথসচাইল্ডসহ তৎকালীন নেতারা ইউরোপের অনেক দেশে প্রচারণা চালান। বহু কূটনৈতিক কাটাছেঁড়ার পর ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী আর্থার বেলফোর এই দাবিকে সমর্থন জানিয়ে রথসচাইল্ডের কাছে একটি চিঠি লেখেন এবং এই চিঠিটি যুক্তরাজ্যের জায়নিস্ট ফেডারেশনের কাছে পৌঁছে দেওয়ার আহ্বান জানান। এই চিঠিটিই ‘বেলফোর ডিক্লেয়ারেশন’ বা ‘বেলফোর ঘোষণা’ হিসেবে পরিচিত। লেটার ফ্রম বার্মিংহাম জেল (১৯৬৩): বিচ্ছিন্নতা ও বর্ণবাদের বিরুদ্ধে অহিংস প্রতিবাদের পক্ষে এক খোলা চিঠি লিখেছিলেন মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র। এটিই Letter from Birmingham Jail নামে পরিচিত।
এই চিঠিতে তিনি বলেন, আদালতের ন্যায়বিচার পাবার আশায় চিরকাল অপেক্ষা করার থেকে অন্যায় আইন ভঙ্গ করা ও তার বিরুদ্ধে সরাসরি পদক্ষেপ নেওয়া জনগণের নৈতিক দায়িত্ব। আজও কৃষ্ণাঙ্গদের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র অমর হয়ে আছেন, অমর হয়ে আছে তার লেখা এই চিঠিটিও। রুজভেল্টকে আইন্সটাইনের চিঠি (১৯৩৯): এই চিঠিটি আইন্সটাইন-সিলার্ড চিঠি নামেও পরিচিত। জানা যায়, হাঙ্গেরিয়ান অভিবাসী লিও সিলার্ড, ইউজিন উইগনার এবং এডওয়ার্ড টেলার আইন্সটাইনকে প্ররোচিত করেন জার্মানির পারমাণবিক বোমা তৈরির সম্ভাবনা সম্পর্কে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্টকে সতর্ক করতে এই চিঠিতে যুক্তরাষ্ট্রকেও পারমাণবিক শক্তি সম্পর্কে সচেতন হওয়ার অনুরোধ করা হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসাত্মক ম্যানহাটন প্রজেক্টের অন্যতম প্রধান এক নিয়ামক হিসেবে কাজ করে এই চিঠিটি।
শিক্ষকের কাছে পিতার চিঠি: শব্দের জাদুকর প্রথম মার্কিন রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন ১৮৬১ হতে ১৮৬৫ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকাকালে তার পুত্রের স্কুলের প্রধান শিক্ষকের কাছে একটি চিঠি লিখেছিলেন। এই চিঠিটি ঐতিহাসিক এক চিঠি হিসেবে স্থান তো পেয়েছেই, সেই সাথে বিশ্বের শিক্ষক, পিতা ও সন্তানদের নৈতিক মূল্যবোধের জায়গাটি কেমন হওয়া উচিত তা বিশেষভাবে তুলে ধরেছেন চমৎকারভাবে। সুলিভান বল্যুর চিঠি (১৮৬১): আমেরিকার গৃহযুদ্ধের সময় ইউনিয়ন আর্মি সুলিভান বল্যু তার স্ত্রী সারার কাছে একটি চিঠি লেখেন।
এই হৃদয়গ্রাহী চিঠিতে গৃহযুদ্ধের প্রাক্কালে তিনি যে আবেগগুলি অনুভব করছিলেন, তার এক মিশ্র প্রতিফলন ঘটে। উদ্বেগ, ভয়, অপরাধবোধ, দুঃখ, একই সাথে সন্তানদের প্রতি তার অবিরাম ভালোবাসা ও সর্বোপরি জাতির প্রতি তার কর্তব্যবোধের উল্লেখ ছিল এই চিঠিতে। চিঠি একটি দলিলের মতো। আবেগের লিখিত রূপ চিঠি। একটি চিঠি হতে পারে সকল মুশকিলের আসান। চিঠিতে যেমন আছে প্রয়োজনের তাগিদ তেমনি আছে সহজ আবেগ, একরাশ ভালোবাসা।