অনিয়ম, দুর্নীতি এবং পতিত স্বৈরাচার হাসিনা সরকারের আদর্শ লালন করে স্বৈরাচার পাঠাগার নির্মাণের অভিযোগ এনে ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জের আলীনগর কারিগরি ও বাণিজ্যিক কলেজের অধ্যক্ষ মোস্তফা কামালকে তার কক্ষের ভিতরে রেখে বাহিরে তালা দিয়ে অবরুদ্ধ করে রাখার ঘটনা ঘটেছে।
আজ রবিবার সকাল ১১ টার দিকে কলেজের শিক্ষক মিলনায়তন ও অধ্যক্ষের কক্ষে তালা ঝুলিয়ে দেয় বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা। প্রায় ৪ ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার পর বিকাল ৩ টার দিকে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট সালাউদ্দিন বিশ্বাস আলীনগর কলেজে গিয়ে শিক্ষার্থীদের বুঝিয়ে অধ্যক্ষকে উদ্ধার করে নিয়ে আসেন।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার থেকে কলেজের এইচএসসি(বিএমটি) প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীদের বর্ষমধ্য পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করেনি।
এদিকে কলেজে স্বৈরাচার হাসিনা সরকারের নানাবিধ বই সংবলিত গ্রন্থাগার স্থাপনকে ঘিরে সমালোচনার ঝড় বইছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।
কলেজ সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯৯ সালে আলীনগর কারিগরি ও বাণিজ্যিক কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। স্বনামধন্য এই কলেজে ২০২৩ সালের ১৫ মার্চ অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করেন মোস্তফা কামাল। তিনি যোগদানের প্রায় তিন বছর হলেও শিক্ষা ব্যবস্থার তেমন কোন উন্নতি হয়নি।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ,অভিভাবক ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে একবার সেশন ফি নেওয়ার কথা থাকলেও নেওয়া হয়েছে একাধিকবার। উপবৃত্তি প্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ৪০% বেতন নেওয়ার কথা থাকলেও নেওয়া হয় ১০০%। বিগত বছরগুলোতে যেখানে ৫০০ টাকা ফি নেওয়া হয়, এবছর তা বাড়িয়ে ৬০০ টাকা নেওয়া হচ্ছে। এখানেই শেষ নয়,গত বছর ভর্তি বাবদ ৫৬০০ টাকার রশিদ দিয়ে জোরপূর্বক আরও ২০০ বাড়িয়ে নেওয়া হয় শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে। তখন বলা হয়েছিল শিক্ষার্থীদের আইডিকার্ড ও মসজিদ উন্নয়নের জন্য ২০০ টাকা বাড়িয়ে নেওয়া হয়। কিন্তু শিক্ষার্থীরা আদৌ আইডিকার্ড পায়নি। বরং চলতি বছর আইডিকার্ড বাবদ আরও ১১০ টাকা ধার্য করেছেন অধ্যক্ষ। এছাড়াও ২০২৪ সালে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি বাবদ ৫৬০০ টাকা নিলেও চলতি বছর তা বাড়িয়ে ৬০০০ টাকা করা হয়েছে। এমনকি বিভিন্ন সময়ে কলেজের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অশোভন আচরণ, শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করাসহ কলেজে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির রয়েছে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে।
কলেজের বিএম শাখার দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মিলন মিয়াসহ কয়েকজন শিক্ষার্থী বলেন, ‘অধ্যক্ষ স্যার অনিয়ম, দুর্নীতি করে আমাদের কাছ থেকে একাধিকবার সেশন ফি, অতিরিক্ত পরীক্ষা ফি ও বিভিন্ন কৌশলে মোটা অঙ্কের আদায় করছেন। এসবের বিরুদ্ধে আমরা প্রতিবাদ করলে তিনি (অধ্যক্ষ) আমাদের হুমকি দিয়ে বলেন- আওয়ামী লীগ আমলে কেউ আমার কিছু করতে পারেনি এখনও পারবে না।
শিক্ষার্থীরা আরও বলেন, ‘অধ্যক্ষ স্যার এখন স্বৈরাচার হাসিনা ও তার দোসরদের নিয়ে লেখা বই দিয়ে গ্রন্থাগার করে তুলেছেন। মনে হচ্ছে তিনি কলেজকে স্বৈরাচারের পাঠশালা বানাতে চান। আমাদের এক দফা এক দাফি এই দুর্নীতিবাজ, অসৎ ও স্বৈরাচারের দোসর অধ্যক্ষকে পদত্যাগ করতে হবে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে কলেজের অধ্যক্ষ মোস্তফা কামাল বলেন, কলেজের জমিদাতা আব্দুল কদ্দুস, তার ছেলে আয়নাল হক এবং মঞ্জুরুল হক আমাকে কলেজের ফান্ড থেকে ৫০ লক্ষ টাকা দিতে বলে। আমি তাদের টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে তারা এমন নাটক সাজিয়ে আমার অফিসে তালা লাগিয়ে হেনস্তা করেছে।
স্বৈরাচার গ্রন্থাগার সম্পর্কে জানতে চাইলে অধ্যক্ষ বলেন, এই বইগুলো বস্তায় ভিতরে ভরা ছিল। মবকারীরা এগুলো বের করে সাজিয়ে রেখে ছবি তুলে এবং ভিডিও ধারণ করেছে। তবে বিষয়টি সম্পর্কে জমিদাতা আব্দুল কদ্দুস ও তার ছেলেদের সাথে যোগাযোগ করলে তারা বলেন, অধ্যক্ষ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট অভিযোগ তুলেছে আমাদের ওপর।
এ বিষয়ে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট সালাউদ্দিন বিশ্বাস বলেন, ‘অধ্যক্ষকে অবরুদ্ধ করার সংবাদ পেয়ে আমি কলেজে গিয়ে শিক্ষার্থীদের বুঝিয়ে অধ্যক্ষকে উদ্ধার করে নিয়ে আসি। কলেজের সমস্যা সমাধানে গভর্নিং বডির সদস্যরা পরবর্তী সিদ্ধান্ত নিবেন।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও আলীনগর কারিগরি ও বাণিজ্যিক কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতি সানজিদা রহমান বলেন, ‘রবিবার সারাদিন আমি জেলায় মিটিংয়ে ব্যস্ত ছিলাম। আসলে কি নিয়ে এমন ঘটনা ঘটেছে তা আমি এখন অবগত না। বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।